মাতামহ ক্ষিতিমোহন সেনের যুক্তসাধনার তত্ত্বের উপরে স্কুল, কলেজের ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, গবেষকের সঙ্গে আলোচনায় বসেছিলেন অমর্ত্য। আয়োজন করেছিল প্রতীচী ট্রাস্ট। সেখানে সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী রূপকথা সরকার নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদকে প্রশ্ন করে, ‘যুক্তসাধনার উপকারিতা কী? কী ভাবে আমরা এক হয়ে কাজ করতে পারি?’ সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়েই অমর্ত্য নিজের মনোভাব প্রকাশ করেছেন। আবার এক শিক্ষক প্রশ্ন করেন, ‘দেশের বৈচিত্র আমরা কী ভাবে ধরে রাখতে পারি?’ এ প্রসঙ্গে অবশ্য প্রচলিত মতবাদের খানিকটা ভিন্ন ছবি তুলে ধরেছেন অমর্ত্য। তাঁর পাল্টা প্রশ্ন, ‘বৈচিত্র কি সব সময়ে ভালো?’ তাঁর ব্যাখ্যা, ‘ইদানীং ভারতকে নানা ধরনের বৈচিত্র গ্রাস করেছে, যা আগে হয়নি।’ উদাহরণ হিসেবে জানিয়ে দেন, যে ভাবে একাংশের হাতে প্রচুর অর্থ আর অন্যদল অভুক্ত, সেই বৈচিত্র তিনি পছন্দ করেন না। তাই অমর্ত্য মনে করেন, ‘বৈচিত্রের প্রশংসা এবং সমস্যা, দুটো দিকই দেখার দরকার আছে।’ এ প্রসঙ্গে তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়ে মহাত্মা গান্ধীর (Mahatma Gandhi) কথা তুলে আনেন- ‘গান্ধী নিজেও স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রস্তুতি-পর্বে বলেছিলেন আমাদের মধ্যে পৃথকীকরণ কমাতে হবে। আরও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।’ অর্মত্য মনে করেন, ‘অন্যকে সম্মান জানানোর ক্ষমতা আমাদের কমছে। আর সেটাই আমাদের পিছিয়ে থাকার অন্যতম কারণ।’
নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদের বক্তব্য নিয়ে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোর। তৃণমূলের রাজ্যসভার সচেতক সুখেন্দুশেখর রায়ের ব্যাখ্যা, আসলে অমর্ত্য সেন দেশজুড়ে চলা ‘বিভাজনের বৈচিত্র’-এরই সমালোচনা করতে চেয়েছেন। তাঁর ব্যাখ্যা, ধর্ম, জাতি, লিঙ্গ, ভাষার নিরিখে যে ভাবে বিজেপি পুরো দেশকে বিভাজিত করেছে, সেই পরিস্থিতির বদল চেয়েছেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘শুধু ভারত নয়, সারা পৃথিবীতেই কর্তৃত্ববাদী শাসন বেশি দিন চলেনি। ভারতেও যে চলবে না, সেটাই তিনি বোঝাতে চেয়েছেন। আমরা তাঁর এই বক্তব্যকে স্বাগত জানাই।’ যদিও বিজেপির সর্বভারতীয় সহ-সভাপতি দিলীপ ঘোষের কটাক্ষ, ‘উনি তো অর্থনীতিবিদ! অর্থনীতি নিয়ে কিছু বলেছেন কি?’ তাঁর সংযোজন, ‘ভারত নিয়ে অমর্ত্য সেনকে ভাবতে হবে না। সারা পৃথিবীতে ভারত এখন শক্তিশালী। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের অবস্থা বেশি দিন এমন চলবে না। এখানে পরিবর্তন হবেই, সেটা অমর্ত্যবাবু যেন জেনে রাখেন।’ সুখেন্দুশেখরের অবশ্য পাল্টা কটাক্ষ, ‘অমর্ত্য সেন শুধু বাংলা বা ভারতের নন, তাঁর কথায় সারা পৃথিবীর জ্ঞানচর্চার সাধনা হয়। তাই তাঁর সম্পর্কে বলার আগে পেটে কালি-অক্ষরের চিহ্ন কিছুটা হলেও থাকতে হয়।’ সিপিমএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের বক্তব্য, ‘একজন প্রকৃত চিন্তাবিদ হিসেবেই তিনি তাঁর উপলব্ধির কথা জানিয়েছেন।’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে অমর্ত্য সেনের ভারত যে ট্র্যাডিশন বহন করে, যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নয়, বহুত্ববাদের কথা বলা হয়, ঐক্যের কথা বলা হয়- প্রখ্যাত এই অর্থনীতিবিদ সেই চিরন্তন ভাবনাকেই ব্যক্ত করেছেন বলে মনে করেন সেলিম।
