Ei somoyer Bhabona

বার্ধক্য--কি অপরাধ ?

সুভাষ চন্দ্র মজুমদার

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে বেশির ভাগ মানুষই যেন স্বতঃসিদ্ধের মতো ধরে নেয়, বৃদ্ধ মানেই সমস্যা এবং অনাকাঙ্খিত জনতা অথচ একজন বয়স্ক মানুষ পরিবারের মানসিক ও সমৃদ্ধির ব্যাপারে যতটা বল-সঞ্চারে সমর্থ হন, একজন কম বয়সীর পক্ষে সেই কাজ অতটা সহজ সাধ্য নয়৷

                আসলে ‘‘বয়সের সংখ্যাটাই বৃদ্ধদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা নয়, সমস্যা তাঁদের দৈহিক সক্ষমতাকে নিয়ে’’ এ মন্তব্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার৷ সমীক্ষায় জানা যায়—শতকরা ৭২ জন প্রবীন নাগরিক একাই থাকেন এবং ২৬ শতাংশ মাত্র পরিবারের সাথে থাকেন৷

                আসল বিষয়টা হল উপরোক্ত বক্তব্য সকলেরই জানা এবং এসব বহুচর্চিত কথাবার্তা বলার উদ্দেশ্য আমার নয়, তবুও মনের ভেতরের খেলা ঘরের খেলা তো থামানো যায় না তাই বিষয়গুলোর অবতারনা৷

                পরিণত বয়সের প্রান্তসীমার ওপরে যাঁরা দাঁড়িয়ে তাদের অভিজ্ঞতা বিচিত্র৷ বয়স যদি বার্ধক্যের মাপকাটি হয় তাহলে অনেকেই তাঁরা বৃদ্ধ৷ সেই বৃদ্ধদের মধ্যে এমনও অনেকে আছেন মনের দিক থেকে তাঁরা এখনও তরুন৷ সৃজনশীল চিন্তাধারা সামাজিক মূল্যবোধ এবং দায়-দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতনতা, কর্মঠ স্বাস্থ্য এবং মানসিক বল, অনেকের মধ্যে এসবের কোনো অভাব নেই৷ অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং নবীন প্রজন্মের সঙ্গে অনাবিল সম্পর্ক যদি বজায় থাকে, তাঁদের আচরণ এবং কাজকর্মের মধ্যে প্রানেরই লক্ষণ প্রকাশ পায়৷ নিজেদের তাঁরা বৃদ্ধ বলে মনে করেন, পরিত্যক্ত হিসেবে ভাবতে শুরু করেন তখনই সমাজ যখন সেই ভাবে তাদের ভাবতে শুরু করেন, তখন ‘‘প্রানের প্রদীপ জ্বালিয়ে ধরায়’’ থাকতে ভারবোধ হয়৷

                আমাদের জীবনে সফলতা যেমন সত্য বিফলতাও তেমনি অনিবার্য্য এবং এই সামান্য সত্য সকলেই অবগত আছি৷ তবুও বিচার বিবেচনার অভাবে এবং আবেগের  প্রাবল্যে এবং কামনা-বাসনার তাণ্ডবে আমরা জীবন-যন্ত্রনাকে অবশ্যম্ভাবী করে তুলেছি৷ সফলতা যেমন ব্যাক্তিকে সফল করে, তোলে বিফলতা ব্যাক্তির শক্তিকে ধবংস করে এবং অক্ষম অযোগ্য করে তোলে৷

                বিফলতাকে সাফল্যের স্তম্ভ করে তোলা সকলেই আমরা পারিনা এবং সেই থেকেই নৈরাশ্য এবং সবশেষে একাকীত্ববোধ অথবা বাস্তব সম্পর্ক স্থাপনের বিফলতা আমাদের মনকে কাতর করে তুলেছে৷

                আমার জীবনে সে জিনিষগুলো আমাকে কষ্ট দেয় সেগুলোর গুরুত্ব কমিয়ে দিয়ে নিজের মতো শান্তিতে ও আনন্দে থাকতে চাই৷ বাস্তব এবং জীবনের ভূল মূল্যায়ণ এবং সেই সঙ্গে জীবনের সমস্যার সামনা সামনি না করে এড়িয়ে গেলেই আমরা স্নায়বিক পীড়ায় ভুগি৷ ব্যাক্তি জীবনের মানসিক চাপ ও উৎকণ্ঠাগুলোকে সহনীয় না করে তুলতে পারলে আত্মবিশ্বাস ও আত্মপ্রত্যয় হারিয়ে ফেলি৷

                একজন বয়স্ক নাগরিক হিসাবে এই আপনজন ও সন্ততিদের জন্য বিষাদগ্রস্থ জীবন যাপন আমাদের চারপাশে অত্যন্ত স্বাভাবিক ঘটনা এবং এই নিয়ে কাউকে অনুযোগ, অভিযোগ করার মতো মনটাও হারিয়ে ফেলেছি৷ যোগাযোগের অভাবে-অক্ষমতায় আক্রান্ত আজকের মা-বাবা৷ সন্তানদের সাথে মানসিক ও সামাজিক সেতু বন্ধনের অভাব এবং একাকীত্ববোধ, নিঃসঙ্গতা মনকে কাতর করে ফেলেছে৷ এই শহরের অনেক বাসস্থান এখন বৃদ্ধাশ্রমের—নামান্তর মাত্র, আর—বৃদ্ধাশ্রমের -সংখ্যা বৃদ্ধিতো আছেই৷

                আমার মনে হয় বয়স্ক হওয়া মানেই পরিত্যক্ত হওয়া নয়৷ এই সময়ে বয়স্কদের স্বাস্থ্য এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে বিশ্বব্যাপী আলোচনার শেষ নেই৷ আমাদের দেশেও অসংখ্যN.G.O. বৃদ্ধদের সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসছেন৷ প্রতিবছর ‘‘বিশ্ব বৃদ্ধ দিবস’’ পালিত হয়৷ অবসর প্রাপ্ত এই বৃদ্ধরা যেন কোনো মতেই অবহেলার শিকার না হয়৷ রুটী যেমন মানুষকে দিয়েছে বেঁচে থাকার রসদ, আমাদের শিল্প-সংস্কৃতি ও দিয়েছে বেঁচে থাকার আনন্দ৷ বার্ধক্যের ফসল এই পৃথিবীকে করে তুলতে পারে বিপুল ঐশ্বর্য্য শালীনি৷ তাই এই অবসর জীবন যাপন করা বিশাল নাগরিক সমাজকে হতে হবে সৃজনশীল৷ কবিগুরু বলতেন অবসরই সৃষ্টির প্রেরণা দেয় আর আমার এই অবসর ও অবকাশ জীবন যেন আমাকে সেই আনন্দের উৎসস্থলে নিয়ে যায়, তাই পরমপুরুষের কাছে আমার প্রার্থনা৷

                                                                                                ‘‘মগ্ণ হলাম আনন্দময়,

                                                                                                                অগাধ অগৌরবে

                                                                                                পাখির গানে, বাঁশির তানে

                                                                                                                কম্পিত পল্লবে৷’’

                শেষ কথা আমরা চাই ‘‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে’’ এবং আমাদের উত্তরসুরীরা যেন সব-দিকে সফল হয় এবং জীবন যেন সুখী ও আনন্দময় হয়৷

 

                                                                                                                                                                       ১৫ই মার্চ, ২০২৩