First Bengali Cinema : ‘পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য!’ বাঙালির প্রথম ছবি নির্মাণে কত খরচ হয়েছিল জানেন? – hiralal sen was the first filmmaker of bengali cinema know his story


গৌতম বসুমল্লিক

বাঙালির
চলচ্চিত্র নির্মাণ: হীরালাল সেন

কলকাতায় প্রথম বায়োস্কোপ (Kolkata First Bioscope) দেখানো সাহেবদের হাত ধরে আরম্ভ হলেও বাঙালিরাও পিছিয়ে ছিল না। মিনার্ভা থিয়েটারে মিস্টার সুলিভানের Nimatograph দেখানোর অল্পকাল পরেই আসরে নামেন এক বাঙালি, নাম হীরালাল সেন। স্টার থিয়েটারের হ্যান্ডবিলে বায়োস্কোপের বিজ্ঞাপনে লেখা ছিল: “পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য! বায়োস্কোপ!/ আসুন! দেখুন! যাহা কেহ কখনও কল্পনাও করেন নাই! / তাহাই সম্ভব হইয়াছে! ছবির মানুষ, জীবজন্তু জীবন্ত / প্রাণীর ন্যায় হাঁটিয়া ছুটিয়া চলিয়া বেড়াইতেছে…”

Kolkata Cinema Halls : নাটকের বদলে পর্দায় ফুটে উঠল ছবি, দর্শকদের চমকে দিয়েছিল মিনার্ভা
এই বিজ্ঞাপন দেখেই নাকি হীরালাল (Hiralal Sen) ও তাঁর ভাই মতিলাল সেন উদ্যোগী হলেন চলমান ছায়াচিত্র নির্মাণে। আবার কেউ বলেছেন, ময়দানে ফরাসি কোম্পানির তাঁবুতে চলমান ছবি দেখে হীরালাল সেন ছলচাতুরি করে তাঁবুর পিছন দিকে ঢুকে প্রজেক্টর চালানো সাহেবদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে প্রজেক্টর চালানো শেখেন।

যাই হোক, হীরালাল সিনেমার কলাকৌশল শেখার জন্য স্টিফেনসনের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তাঁকে বিস্তর ঘুরিয়ে অবশেষে হতাশই করলেন স্টিফেনসন। হীরালালকে কোনও রকম সহযোগিতাই তিনি করলেন না। ওই সময়ে হঠাৎই এক বন্ধুর সূত্রে ‘জন রেঞ্জ অ্যান্ড সন্স’-এর বায়োস্কোপের যন্ত্রপাতি বিক্রেতার বিজ্ঞাপন দেখে মায়ের কাছ থেকে পাঁচ হাজার টাকা চেয়ে নিয়ে ওই সব যন্ত্রপাতি কিনে ফেললেন। দাদা মতিলাল আর ভাই দেবকীলালকে সঙ্গে নিয়ে ‘সেন ব্রাদার্স’ নাম দিয়ে বায়োস্কোপ দেখানো শুরু করলেন অধুনা বাংলাদেশের ভোলাতে। ওই ১৮৯৮ সালেই ভাগ্নে কুমারশংকর কে সঙ্গে তাঁদের সঙ্গে নিয়ে ‘রয়্যাল বায়োস্কোপ কোম্পানি’ নামে এক সিনেমা দেখানোর ব্যবসা আরম্ভ করলেন হীরালাল। সেটাই ছিল প্রথম বাঙালির চলচ্চিত্র নির্মাণ কোম্পানি। প্রথম দিকে অভিভক্ত বাংলার বিভিন্ন জায়গায় তাঁরা বায়োস্কোপ দেখিয়ে বেড়াতেন, তার পর কলকাতায় এসে থিয়েটারের চলমান ছবি তুলতে আরম্ভ করলেন। এ ব্যাপারে তাঁর প্রধান সহায়ক হলেন সেই সময়ের অন্যতম জনপ্রিয় নট ও নাট্যকার অমরেন্দ্রনাথ দত্ত।

Kolkata First Cinema Hall : দেশের প্রথম সিনেমা হল ছিল কলকাতাতেই, সময়ের ভারে মুছেছে ইতিহাস
৬৮ বিডন স্ট্রিট ঠিকানার পুরনো স্টার থিয়েটারের (Star Theatre) বাড়ি ভাড়া নিয়ে অমরেন্দ্রনাথ দত্ত তখন ‘ক্লাসিক থিয়েটার’ চালাচ্ছেন। ১৯০১-এর ৯ ফেব্রুয়ারি তিনি খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে জানালেন যে, তাদের নাট্যদলের অভিনীত বিশ্ববিখ্যাত ‘ভ্রমর’, ‘আলিবাবা’, ‘হরিরাজ’, ‘দোল লীলা’, ‘বুদ্ধ’, ‘সীতারাম’, ‘সরলা’ প্রভৃতি নাটকের বায়োস্কোপ রূপ তৈরি করা হচ্ছে। যদিও ‘ক্লাসিক থিয়েটার’-এ ১৮৯৯-এর ১৯ মার্চ থেকেই থিয়েটারের পাশাপাশি বায়োস্কোপ দেখানো আরম্ভ হয়েছিল কিন্তু সেগুলো ছিল বিদেশি প্রযোজক-পরিচালকদের তৈরি চলচ্চিত্র। অমরেন্দ্রনাথ দত্ত হীরালাল সেনকে (Hiralal Sen) দিয়ে ‘ক্লাসিক’-এর নামকরা সব থিয়েটারের চিত্ররূপ তৈরি করালেন এবং সেগুলো প্রদর্শনের ব্যবস্থা করলেন।

Che Guevara Daughter In Kolkata : ‘এখন ট্রোলিং স্বাভাবিক’, চে কন্যার সামনে আচমকাই নাচ নিয়ে মুখ খুললেন জয়রাজ
স্টিফেনসন-সহ গোড়ার দিকের সমস্ত বায়োস্কোপওয়ালারাই বিদেশি ছবি এনে দেখাতেন। হীরালাল সেন কিন্তু শুধু ছবি দেখিয়েই থেমে থাকেননি। তিনি থিয়েটার দলের অভিনেতাদের দিয়ে রীতিমতো অভিনয় করিয়ে চলচ্চিত্র তৈরি করেছিলেন। ক্লাসিক থিয়েটারে ‘সীতারাম’ নামকে অমরেন্দ্রনাথ ঘোড়ায় চড়ে মঞ্চে অবতীর্ণ হতেন। হীরালাল সেই দৃশ্যও ক্যামেরাবন্দি করেছিলেন। সেই দিক থেকে বিচার করলে হীরালাল সেনকে ভারতীয় কাহিনিচিত্রের জনক বললেও ভুল হয় না। কিন্তু ঘটনা-বিপর্যয়ে সে শিরোপা তিনি পাননি।অমরেন্দ্রনাথের উৎসাহে হীরালাল লন্ডন থেকে একের পর এক ক্যামেরা ও সিনেমা তৈরি ও দেখানোর যন্ত্রপাতি কেনেন। অমেন্দ্রনাথ নিজেও জমি কেনেন স্টুডিও তৈরির জন্য। এই সময়কালের মধ্যে ‘ম্যাডান কোম্পানি’-সহ আরও অনেক ছোটবড় বায়োস্কোপ কোম্পানি খোলা হতে থাকে। ভাগ্নে কুমারশংকর , দাদা মতিলাল-সহ আরও অনেকেই তাঁকে ছেড়ে অন্য কোম্পানিতে যোগ দেন। তাছাড়া হীরালাল ছিলেন শিল্পী মানুষ তাঁর ব্যবসা-বুদ্ধি কম ছিল। তা ছাড়া ১৯১৬ সালে অমরেন্দ্রনাথের মৃত্যুতে তিনি একাকী হয়ে পড়েন এবং এক সময়ে অন্যদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এঁটে উঠতে না পেরে তাঁর কোম্পানি প্রায় উঠে যায়।তিনি একেবারে নিঃস্ব হয়ে যান। অমরেন্দ্রনাথের মৃত্যুর এক বছরের মধ্যে হীরালাল সেনও প্রয়াত হন আর তার কিছুদিনের মধ্যেই যন্ত্রপাতি ও নথিপত্র-সহ তাঁর বসতবাড়ি পুড়ে যায়। সেই সঙ্গেই শেষ হয়ে যায় বাঙালির নিজস্ব উদ্যোগে চলচ্চিত্র নির্মাণের একটা অধ্যায়।

তথ্যসূত্র:

শংকর ভট্টাচার্য, বাংলা রঙ্গালয়ের ইতিহাসের উপাদান (দ্বিতীয় খণ্ড)
শংকর ভট্টাচার্য, বাংলা রঙ্গালয়ের ইতিহাসের উপাদান (তৃতীয় খণ্ড)
রমাপতি দত্ত, রঙ্গালয়ে অমরেন্দ্রনাথ
রথীন চক্রবর্তী, কলকাতার নাট্যচর্চা
চণ্ডী মুখোপাধ্যায়, বাংলা সিনেমার ইতিকথা: দুই বাংলার চলচ্চিত্র (১৯০৩—২০১৪)
সুজয় ঘোষ, কলকাতার সিনেমা হল: পটভূমি ও ইতিবৃত্তান্ত
সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়, জাতীয় চলচ্চিত্রের ধারণা (সেমিনার প্রতিবেদন)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *