Nati Binodini : রক্ষিতা হওয়ার প্রস্তাব থেকে বিশ্বাসঘাতকতা! বরাবর বঞ্চনার শিকার হয়েছেন নটী বিনোদিনী – nati binodini was a victim of deprivation in every stage of life know her struggle


গৌতম বসুমল্লিক

অসামান্যা প্রতিভাময়ী হয়েও আজন্ম বঞ্চনা আর অবহেলার শিকার হয়ে জীবন কাটান তিনি। মৃত্যুর ৮২ বছর পরও সেই অবহেলাই পাওনা হল বাংলা পেশাদারি থিয়েটারের অবিংসবাদিত অভিনেত্রী বিনোদিনী দাসীর। আজ থেকে আনুমানিক একশো ষাট বছর আগে, ১৮৬৩ সালে তৎকালীন কর্নওয়ালিশ স্ট্রিটের যে ১৫৪ নম্বর বাড়িতে বিনোদিনী জন্মগ্রহণ করেছিলেন, বছর দশেক আগে, বিনোদিনীর জন্মের ১৫০ বছর উপলক্ষে সেই বাড়ির সামনের ফুটপাথে ‘চেতনা গণ-সংস্কৃতি সংস্থা’র উদ্যোগে একটা পাথরের ফলক বসানো হয়েছিল। মাত্র দশ-এগারো বছরের মধ্যেই সেটা ভগ্নপ্রায় অবস্থায় পরিণত হয়েছে। এবং আশ্চর্যের বিষয় হল, যখন ওই ফলকটাকে উপড়োনো অবস্থায় দেখা যাচ্ছে, সেই সময়েই বিনোদিনী দাসীকে নিয়ে তৈরি হচ্ছে এক চলচ্চিত্রও।

Noti Binodini Shooting : শ্যুটিং শুরুর একমাসের মধ্যেই বন্ধ ‘নটী বিনোদিনী’-র কজ! জানালেন পরিচালক
বিনোদিনী অবশ্য সে বাড়িতে চিরকাল বসবাস করেনি। তাঁর জন্ম এবং পরবর্তী সময়ে সেটা ছিল খোলার চালের বাড়ি। পরে সেখানকার মালিকানা বদল হয়, তৈরি হয় পাকাবাড়ি আর বিনোদিনীও সেই জায়গা ছেড়ে কর্নওয়ালিস স্ট্রিটের নতুন স্টার থিয়েটারের পাশে সাবেক রাজাবাগান স্ট্রিটে নিজের বাড়িতে উঠে যান। বর্তমানে সে রাস্তা অবশ্য নটী বিনোদিনীরই নামাঙ্কিত।

Soumitra Banerjee Death Reason: খল চরিত্রের ‘জান’, মহিলাদের ত্রাস! বাস্তবে কেমন ছিলেন অভিনেতা সৌমিত্র বন্দ্যোপাধ্যায়?
সাম্প্রতিক কালের ফলক উপড়োনোর ঘটনা একটা নিদর্শন মাত্র। বঞ্চনা, অবহেলা বিনোদিনীর চির জীবনের সঙ্গী। যৌনকর্মীর সন্তান বলে বাংলার পেশাদারি নাট্যযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হয়েও চিরকাল তাঁকে সমাজের তথাকথিত অভিজাত শ্রেণির পায়ের তলাতেই থাকতে হয়েছে। এবং সেই বঞ্চনার সূচনা তাঁর বালিকাবেলা থেকেই। সে যুগের রীতি অনুসারে খুব কম বয়সে বিয়ে হয়েছিল বিনোদিনীর কিন্তু, অল্পকাল পরে তাঁর স্বামীর মাসি এসে স্বামীকে তাঁর কাছ থেকে নিয়ে গিয়ে অন্যত্র বিয়ে দেন। কিছুকাল পরে তাঁর ছোট ভাইয়ের মৃত্যু হয়। নিঃসঙ্গ বিনোদিনী স্থানীয় এক অবৈতনিক স্কুলে পড়াশোনার সঙ্গে গান শেখাও আরম্ভ করলেন প্রতিবেশী সঙ্গীতশিল্পী গঙ্গাবাঈয়ের কাছে। তিনি ছিলেন সে যুগের বেশ নামকরা এক মুজরো গায়িকা। অনেক হোমরা-চোমরা লোক আসতেন গঙ্গাবাঈয়ের ঘরে। তাঁদেরই এক জন পূর্ণচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ে উদ্যোগে বিনোদিনী দশ টাকা বেতনে ‘গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটার’-এ যুক্ত হলেন।

Binodini Movie : টলি-বলি মিলিয়ে একের পর এক বড় চমক বিনোদিনীতে, নজরকাড়া কাস্টিংয়ে বাজিমাত
গান থেকে থিয়েটার দলে। ১৮৭৪-এর ১২ ডিসেম্বর ‘শত্রুসংহার’ নাটকে দ্রৌপদীর সখীর ভূমিকায় তার প্রথম অভিনয়। জন্ম হল বাংলা থিয়েটারের সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী বিনোদিনীদাসীর। কিন্তু, বেশি দিন নয়, মাত্র চোদ্দ বছর বাংলা রঙ্গালয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। থিয়েটারের রাজনীতি ও দলাদলিতে বিরক্ত হয়ে বিনোদিনী অভিনয়-জীবন শেষ করেন ১৮৮৭-র ১ জানুয়ারি। ওই দিন বিডন স্ট্রিট ‘স্টার’-এ ‘বেল্লিক বাজার’ নাটকে রঙ্গিনীর চরিত্রতেই তাঁর শেষ অভিনয়। ওই চোদ্দ বছরে ‘গ্রেট ন্যাশানাল’, ‘বেঙ্গল থিয়েটার’, ন্যাশনাল থিয়েটার’ ও ‘স্টার থিয়েটার’— ওই চারটি নাট্যদল এবং অন্যান্য ছোটখাটো ভূমিকা নিয়ে কমবেশি তিপ্পান্নটি চরিত্রে অভিনয় করেন বিনোদিনী।

‘গ্রেট ন্যাশানাল’ থিয়েটারে থাকার সময়ে মালিক প্রতাপচাঁদ জহুরির আচরণে বিরক্ত হয়ে গিরিশচন্দ্র ঘোষের দল নতুন দল খুলতে উদ্যোগী হলেন। বিনোদিনীকে রক্ষিতা হিসেবে পাওয়ার সর্তে টাকা জোগালেন গুর্মুখ রায় মুসাদি নামে এক মাড়োয়ারী যুবক। ১৮৮৩ সালে ৬৮ বিডন স্ট্রিটে নির্মিত হল থিয়েটার ভবন। কথা ছিল, বিনোদিনীর নাম অনুসারে তার নাম হবে বি থিয়েটার, কিন্তু গিরিশচন্দ্র ও অন্য পুরুষ অভিনেতাদের চক্রান্তে থিয়েটারটি ‘স্টার থিয়েটার’ নামে রেজিস্ট্রি হল। বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হলেন বিনোদিনী। পরে গুর্মুখ তাঁকে ছেড়ে যান।

Kangana Ranaut Rukmini Maitra : ‘আমার ছবি আগে…’, কঙ্গনার সঙ্গে তুলনায় তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য ‘নটী’ রুক্মিনীর
প্রেমের ক্ষেত্রেও বারংবার প্রবঞ্চনার শিকার হয়েছেন বিনোদিনী। গুর্মুখ রায় ছাড়াও সে যুগের বিখ্যাত চিকিৎসক রাধাগোবিন্দ কর, বেঙ্গল থিয়েটারের মালিক শরচ্চন্দ্র ঘোষ, রংপুরের এক জমিদার-পুত্র এবং স্বয়ং গিরিশচন্দ্র-সহ আরও বহু পুরুষের নাম জড়িয়েছে বিনোদিনীর সঙ্গে, এমনকি জড়িয়েছে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম পর্যন্ত। কিন্তু, কোনও প্রেমই শেষ অবধি পূর্ণতা পায়নি। ব্যতিক্রম উত্তর কলকাতার এক বনেদি সিংহ পরিবারের নাট্যমোদী এক বিনোদিনী-প্রেমিক। সম্ভবত ১৮৮৯ বা ৯০ তে তিনি বিনোদিনীকে জায়ার মর্যাদা দেন। পিতৃত্ব স্বীকার করেন তাঁর কন্যা শকুন্তলার। ১৯১২-এ তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত বিনোদিনী তাঁর সঙ্গেই থেকেছেন। তারপর আরও তিরিশ বছর বেঁচেছিলেন বিনোদিনী নিঃসঙ্গ একাকী হয়ে, অবহেলার স্মৃতিকে পাথেয় করে। সাম্প্রতিক জন্মস্থানের ফলক উপড়ে ফেলা তারই এক নিদর্শন।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *