Park Street : এককালে ঘুরত বাঘ-ভাল্লুক! দেশের গর্ব পার্ক স্ট্রিটের নামকরণ কী ভাবে? – park street kolkata ranked among top 30 high street of india know how it got its name during british era


গৌতম বসুমল্লিক

রিয়েল এস্টেট কনসালট্যান্ট সংস্থা ‘নাইট ফ্রাঙ্ক’-এর সমীক্ষা অনুসারে প্রকাশিত দেশের ত্রিশটা ‘হাই স্ট্রিট’-এর তালিকায় স্থান পেয়েছে কলকাতার পার্ক স্ট্রিট-ক্যামাক স্ট্রিট এলাকা। তালিকার শীর্ষে রয়েছে বেঙ্গালুরুর এমজি রোড, দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে হায়দরাবাদের সোমাজিগুদা, তৃতীয় স্থানে মুম্বইয়ের লিঙ্কিং রোড, চতুর্থ স্থানে রয়েছে দিল্লির সাউথ এক্সটেনশন রোড আর পঞ্চম স্থানে রয়েছে কলকাতার এই দুই সাহেব পাড়া।

আরও পড়ুন : Park Street Kolkata: তালিকায় পার্ক স্ট্রিট, দেশের বিরল স্বীকৃতি শহরের সাহেবপাড়ার

কলকাতার যে রাস্তা আজ দেশের অন্যতম ‘হাই স্ট্রিট’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে আড়াইশো বছর আগে সে জায়গা ছিল জঙ্গল। বাঘের মতো ভয়ংকর জন্তু-জানোয়ারও সেখানে ঘুরে বেড়াত অবাধে। পলাশির যুদ্ধের পরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নতুন কেল্লা তৈরি করবার জন্য গোবিন্দপুর গ্রামটা বেছে নিল আর জঙ্গল কেটে চৌরঙ্গি থেকে পূর্ব-পশ্চিম বরাবার এখনকার পার্ক স্ট্রিট রাস্তা তৈরি করে উচ্ছেদ হওয়া দরিদ্র শ্রেণির লোকেদের সেখানে থাকতে দিল। পাশাপাশি সেখানে তৈরি করা হল অনেকগুলো কবরখানা।

Kolkata Metro : বিমানবন্দর মেট্রো স্টেশনে বিশেষ ব্যবস্থা, নিমেষেই এয়ারপোর্ট পৌঁছবেন যাত্রীরা
নামকরণ অনেক পরে হলেও পার্ক স্ট্রিট রাস্তাটা তৈরি হয়েছিল ১৭৬২ নাগাদ। দেশিয় দরিদ্র মানুষজনের আবাস হলেও ওই রাস্তায় তৈরি করা হয়েছিল বেশ কয়েকটা সাহেবদের কবরখানা। ওই রাস্তা ধরে পশ্চিম থেকে পূর্ব দিক বরাবর হাঁটলে লোয়ার সার্কুলার রোডের কাছে দক্ষিণ দিকে রয়েছে ‘সাউথ পার্ক স্ট্রিট সিমেটরি’। সেখানে রয়েছে হিন্দু স্টুয়ার্ট, হেনরি লুই ভিভিয়ান ডি’রোজিও প্রমুখ ব্যক্তিদের কবর। আর তার ঠিক বিপরীতে, উত্তর দিকে ছিল ‘নর্থ পার্ক স্ট্রিট সিমেটরি’। ওই কবরখানা বন্ধ করে সেখানে তৈরি হয়েছে অ্যাসেম্বলি অফ গড চার্চ স্কুল, বাজার, ব্যাঙ্ক ইত্যাদি। আর ছিল ফরাসি কবরখানা। সেটাও এখন আর নেই। আরও পূর্ব দিকে এগোলে লোয়ার সার্কুলার রোডের উপরে পরবর্তীকালে তৈরি হয়েছে আরও একটা কবরখানা। সেখানে রয়েছে ড্রিংকওয়াটার বেথুন, মাইকেল মধুসূদন দত্ত প্রমুখ ব্যক্তিদের কবর। পার্ক স্ট্রিটের পার্শ্ববর্তী কড়েয়া রোডেও আছে স্কটিশ কবরখানা।

Kolkata Museum : বার বার ঠাঁইনাড়া, ৩০ হাজার প্রত্নতাত্ত্বিক বস্তুতে ঠাসা অশুতোষ মিউজিয়াম আজও লোকচক্ষুর অন্তরালে
রাস্তা তৈরির আগে জায়গাটার পরিচিতি ছিল ‘বাদামতলা’ নামে কিন্তু ওই রাস্তায় একাধিক কবরখানা ছিল বলে দেশিয় লোকেদের কাছে নাম হয়ে গিয়েছিল ‘গোরস্থান কা রাস্তা’। সাহেবরা বলত ‘Burial Ground Road’।

ঊনবিংশ শতকের গোড়ার দিকে ‘লটারি কমিটি’ নামে এক কমিটি তৈরি করা হয়েছিল। তারা লটারির মাধ্যমে টাকা তুলত। প্রাইজমানির টাকা বাদ দিয়ে অবশিষ্ট টাকায় কলকাতার বিভিন্ন রাস্তাঘাট তৈরি করত। সেই সময়ে ওই অঞ্চলে বসবাসকারী দরিদ্র লোকজনকে উচ্ছেদ করে বা অন্যত্র সরিয়ে দিয়ে লটারি কমিটি পার্ক স্ট্রিট ও তার আশপাশের এলাকা নিয়ে সাহেবপাড়া তৈরি করে।

New Town Monorail : নিউটাউনে মনোরেল! মেট্রোর পর গতি বাড়িয়ে আর‌ও স্মার্ট কলকাতা
মিডলটন রোয়ে এখন যেখানে ‘লরেটো হাউস’, সেখানে ছিল এক বিশাল বাগানবাড়ি। বিস্তৃত সেই বাগানের সীমানা ছিল পার্ক স্ট্রিট পর্যন্ত। বাগানের সাবেক মালিক ছিলেন উইলিয়ম ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড নামে এক সাহেব। ইনি হলেন সেই লোক, যিনি সিরাজউদ্দোল্লার কলকাতা আক্রমণের সময়ে কেল্লায় আটকে থাকা মহিলা-শিশুদের ফেলেই কেল্লা থেকে খিড়কিপথে নৌকা করে পালিয়ে যান। পরে বিভিন্ন সময়ে ওই বাগানবাড়িতে থেকেছেন বাংলার গভর্নর হেনরি ভানিসটার্ট, সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি এলিজা ইম্পে, বিশপ হিবার প্রমুখ।

Kolkata News : কলকাতায় মিশর রহস্য! এই শহরে রয়েছে ৩ হাজার বছরের মমি, কোথায়?
মহারাজা নন্দকুমারকে ফাঁসির আদেশ দেন যে বিচারপতি, সেই এলিজা ইম্পে ওই বাগানে হরিণ পুষতেন। তাই লোকমুখে জায়গাটির নাম হয় ডিয়ার পার্ক। পরে ওই থেকেই রাস্তার নাম পার্ক স্ট্রিট। এখন পার্ক স্ট্রিটের নাম পালটে হয়েছে মাদার টেরিজা সরণি। এই রাস্তার উপরেই ছিল সে যুগের বিখ্যাত সাহেবি-নাট্যশালা সাঁসুচি থিয়েটার। এখন সেই জায়গায় রয়েছে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ। আর আছে এশিয়াটিক সোসাইটি। ভারতীয় প্রদর্শশালা বা ইন্ডিয়ান মিউজিয়মের সূচনা হয়েছিল এশিয়াটিক সোসাইটির বাড়িতেই।

এককালের বাঘ-ভাল্লুক চরে বেড়ানো জায়গা আজ দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার স্বীকৃতি পেল। কলকাতাবাসীর কাছে তা অবশ্যই গর্বের।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *