Egra Bomb blast : মাংস রান্নার মশলা কোথায়? মাকে জিজ্ঞেস করে ফিরতেই বিস্ফোরণ – egra bomb blast incident villagers who lost their relatives and witnessed the situation described


এই সময়, খাদিকুল: মাংসের বড়া তৈরির সব মশলা খুঁজে পাচ্ছিল না দুই খুদে। রাস্তা পার করে বাজি কারখানায় গিয়ে মাকে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘কর্নফ্লাওয়ার কোথায় রেখেছ?’ মা বাতলে দিয়েছিলেন। লাফাতে লাফাতে ফিরেছিল কিশোর। গরমের ছুটি চলছে। বাড়িতে বড় কেউ নেই। সেই সুযোগে দুই ভাই মিলে খানিক রান্নায় হাত পাকানো। রাস্তা পার করে ঘরে এসে পৌঁছেছে সবে, সেই সময়ই হঠাৎ বিকট আওয়াজ। কেঁপে উঠল পুরো এলাকা। ছুট্টে দরজার কাছে গিয়ে দুই ভাই দেখল উড়ে গিয়েছে বাজি কারখানা।

Egra Blast : বাজি কারখানায় ভয়াবহ বিস্ফোরণে মৃত্যুমিছিল, মালিক ভানু জখম হয়েও ধাঁ
যে কারখানায় কাজ করে মা। যেখান থেকে সবে বেরিয়ে এসেছে মায়ের সঙ্গে কথা বলে। মুহূর্ত খানিক আগে। ভানু বাগের বাজি কারখানা থেকে মাত্র ২০০ ফুট দুরে রাস্তার উল্টোদিকে বাড়িটা। কারখানার শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন মহিলা। তাঁর বড় ছেলে অষ্টম শ্রেণির ছাত্র, ছোট ছেলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। বাড়ির পাশের বাজি কারখানায় কাজ করে দিনে তিনশো টাকা মজুরি জুটত। বড় ছেলে বলল, ‘মাকে জিজ্ঞেস করে এক ছুটে বাড়িতে এসে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরণের বিকট শব্দ।

Egra Bomb Blast: রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে ওঠা-বসা! কী ভাবে উত্থান এগরার বেআইনি বাজি কারখানার ‘মালিক’ ভানুর?
ছুটে বেরিয়ে দেখি, গোটা কারখানাটা বিস্ফোরণে উড়ে গিয়েছে। আগুন জ্বলছে। চারদিক থেকে লোকজন ছুটে আসছে।’ মায়ের দেহটা পুড়ে ঝলসে গিয়েছে। তবু চিনতে ভুল হয়নি দুই ভাইয়ের। গলায় ইমিটেশনের হারটা যে চিনিয়ে দিয়েছে মাকে। কাল থেকে আর উনুন জ্বলেনি বাড়িতে।
মা কী করতেন কারখানায়?
উত্তর এল, ‘বাজি তৈরির কারখানা। কিন্তু মা বলেছিল, ওখানে মায়েদের দিয়ে বোমাও তৈরি করা হতো।’ কারখানায় কাজ করে দুই ছেলের পড়ার খরচ চালাতেন মা। বাবার তেমন আয় নেই। ক্ষোভ যেন ঠিকরে বের হচ্ছে দুই চোখে। বললেন, ‘ভানুকে গ্রামে ঢোকার আগেই গুলি করে মেরে ফেললে, তবে এলাকার মানুষ শান্তি পাবে।’

Egra Blast : এগরার বাজি কারখানায় ভয়াবহ বিস্ফোরণ! রাস্তায় পড়ে ছিন্নভিন্ন দেহ, ঘটনাস্থলে পুলিশ-দমকল
ভানুর কারখানায় কাজ করতে যেতে চাননি শক্তিপদ বাগ। ভানুর খুড়তুতো ভাই তিনি। বিস্ফোরণে মৃত্যু হয়েছে তাঁরও। ভানুর ভাই হলেও বারুদের কারবারে তাঁর মন ছিল না। কারখানার পাশেই তাঁর জমি। এ বছর বাদাম চাষ করেছিলেন। সুখের সংসার ছিল। স্বামীর মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না স্ত্রী মালতী। গ্রামের ভেতরে বাড়ি তাঁদের। ঠিক এই জায়গাতেই আগে ভানুর পুরোনো বাড়ি ছিল। বছর কুড়ি আগে বাজি কারখানায় বিস্ফোরণের পর গোটা বাড়িটাই মাটিতে মিশে গিয়েছিল।

Mamata Banerjee : এগরায় বিস্ফোরণে মৃতদের পরিবারকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ, NIA-তদন্তে আপত্তি নেই মমতার
ভানু এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার পর আস্তে আস্তে নিজের আস্তানাটুকু গড়েছিলেন শক্তিপদ। বিলাপ করতে করতে মালতী বললেন, ‘স্বামী ওই কারখানায় কাজ করতে যেতে চাইত না। বাদাম জমিতে খাটত। কিন্তু ভানুই ওকে বাজি তৈরি করে দিতে বলত। দাদার কথা ফেলতে না পেরে মাস দুই বাজি কারখানায় কাজ শুরু করেছিল।’

Egra Bomb Blast : বাজি মজুত কোথায়? জায়গায় জায়গায় তল্লাশিতে নামল পুলিশ
তিনিও বললেন, ‘শুধু বাজি নয়, কারখানায় বোমাও তৈরি করা হতো। তিন-চারবার বিস্ফোরণের পরও ভাসুরের কারবার বন্ধ হয়নি। ও ফিরলে আবার কারখানা চালাবে। তাই ও যাতে কোনও দিন আর ফিরতে না পারে, তার জন্যে ব্যবস্থা নিতে হবে। আমরা ওর ফাঁসি চাই।’ ২৪ ঘণ্টা ধরে কাঁদতে কাঁদতে চোখের জল শুকিয়ে গিয়েছে মালতীর। এখন শুধুই ক্ষোভ।

Mamata Banerjee Egra Blast : এগরা বিস্ফোরণে মৃত বেড়ে ৯! CID-কে তদন্তভার মমতার, ওসির বিরুদ্ধে পদক্ষেপের ইঙ্গিত
কথা বলতে দেখে এগিয়ে এলেন তিন বোন অঞ্জনা সাউ, চন্দনা সাউ ও দেবশ্রী বাগ। বিস্ফোরণে মা কবিতা বাগকে হারিয়েছেন তাঁরা। ভানু ওঁদের দূরসম্পর্কের দাদু হয়। তবে ভানুর বিরুদ্ধে রাগ উগরে দিয়ে বললেন, ‘ভানুর সঙ্গে আমাদের কোনও সম্পর্ক নেই। লোকটা লোভী ও ভয়ঙ্কর। বাজি তৈরির আড়ালে বোমা তৈরি হতো এই কারখানায়।’ তাঁদের দাবি, ভানুই ভয় দেখিয়ে তাঁদের মা কবিতাকে বাজি কারখানায় কাজ করতে বাধ্য করেছিল।

Egra Bomb Blast: এগরা টু পিংলা বেআইনি কারবারে বারবার বিস্ফোরণ! পুলিশি নজর এড়িয়ে আদৌ সম্ভব?
বাবা গৌরাঙ্গ মাইতি যাত্রা দলে পালাগান করেন। বিস্ফোরণে হারিয়েছেন বছর ২০-র ছেলে অলোক মাইতিকে। ডুকরে কেঁদে উঠে বললেন, ‘আমি অনেকবার ভানুকে বলেছিলাম, আমার ছেলেকে তোমার এই কারবারে জড়িও না। ও ছেলেকে নানা প্রলোভন দেখিয়ে বাজি কারখানায় কাজ করতে বাধ্য করেছিল। শুধু টাকার লোভ নয়, মদ-মাংসের লোভ দেখিয়েও ছেলেকে কাজে নামিয়েছে।’

মাকে কারখানায় কাজ করতে বারণ করেছিলেন কলেজ পড়ুয়া ছেলে কৌশিক। মাত্র সপ্তাহ দুয়েক আগে কারখানায় কাজে যোগ দিয়েছিলেন শ্যামাশ্রী মাইতি। মাকে হারিয়ে ছেলে বলছেন, ‘সংসারের অনটন ঘোচাতে মা সবে কাজে যোগ দিয়েছিল। মাকে কত করে বলেছি, এই কাজ কর না। মা কথা শোনেনি।’ ছেলের এখন আফশোস, কেন আরেকটু জোড়াজুড়ি করলেন না! গুরুতর জখম রবীন্দ্রনাথ মাইতি কলকাতার পিজি হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন। বাড়ির সামনে বসেছিল তাঁর বছর সাতেকের ছেলে। পাশে দাঁড়িয়েছিলেন তাঁর মেয়ে সোনালি। ভাই ও দিদি সাংবাদিক দেখেই জানতে চাইলেন, ‘বাবা কেমন আছে বলতে পারবেন?’

খাদিকুল গ্রাম জুড়ে হাহাকার আর কান্নার রোল। আর রয়েছে ক্ষোভ। ঘটনার পর থেকে নেতা-মন্ত্রী-পুলিশ-সিআইডি-প্রশাসনের লোকজনের আনাগোনার মাঝে একটাই প্রশ্ন ঘুরে বেড়াচ্ছে এলাকায়, অবৈধ বাজি তৈরির কারবার কবে বন্ধ হবে? আর সবাই আওড়াচ্ছেন একটাই কথা, ‘ভানু বাগের ফাঁসি চাই।’



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *