কৈখালী, সিউরির পর এবার জঙ্গলমহলে সিলিকনের জীবন্ত মূর্তি। ঝাড়গ্রামের প্রয়াত সঙ্গীত শিল্পী সার্ণব বাগচী ওরফে তাতানের বাবা-মায়ের ইচ্ছেয় সিলিকন শিল্পী সুবিমল দাস বানালেন তাঁর মূর্তি। ২০২১ সালে ৮ মে ছেলেকে অন্তিম বিদায় জানিয়েছিলেন বাবা-মা। সিলিকন মূর্তির কথা শুনে অন্তত মনের এক চিলতে সান্ত্বনার খোঁজে রকস্টার ছেলের একটা চিহ্ন তৈরির ভাবনা ঝাড়গ্রামের সঙ্গীত শিল্পী সার্ণব বাগচী ওরফে তাতানের বাবা মা।
প্রয়াত গায়কের বাবা মানব বাগচী পেশায় একজন থিম শিল্পী,মা সীতা পাল বাগচী স্কুল শিক্ষক। ভালোই চলছি তিনজনের পরিবার।তবে ছেলেকে সিলিকনে মূর্তি বানিয়ে বাড়িতে রাখতে হবে তা কোনদিনও ভাবেনি। তাই বিরাটিতে সিলিকনের যাদুকর সুবিমল দাস এর ওয়ার্কশপে এসে ছেলেকে বসে থাকতে দেখে নিজেদের আর ধরে রাখতে পারলেন না। বাবা মানব বাগচী নিজেকে কিছুটা সামলে নিলেও মা অঝোরে কেঁদে ফেললেন। বলেন, ”আসলে সিলিকনের তৈরি মূর্তি দেখে বোঝার উপায় নেই। মনে হচ্ছে যেন তাতান বসে আছে।” ছেলে তাতানের মৃত্যুর পর থেকে তাঁর সাটান তাতান নামে ইউটিউব চ্যানেল, রেকর্ড করা গান চালিয়েই ছেলেকে সারাদিন খুঁজে বেড়ায় হতভাগ্য বাবা-মা।
সাংস্কৃতিক জগতে অনেকেই চেনেন ঝাড়গ্রামের এই সঙ্গীত শিল্পীকে। সার্ণব নিজেই গান লিখত, তাঁর নিজের করা সুরেই বহু গান আছে। এমনকি কলকাতা অনেক পুজোর থিম সংও সার্ণব ওরফে তাতানের লেখা, যেগুলো এখনও পুজোর সময় বাজে। এছাড়া রক শিল্পী সার্ণব কলকাতা সহ বিভিন্ন জায়গায় গানের শোও করত। গানকে ভালোবেসে দিব্যি কাটছিল জীবন। চাকরি পেয়েও গানে মন দিতে পারছি না এই অজুহাতে চাকরিও নাকি ছেড়ে দেন এই প্রতিভাবান শিল্পী। কিন্তু আচমকা কোভিড পরবর্তী সময়ে বাজ ভেঙে পড়ে বাাগচী পরিবারে।
হঠাৎই দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয় তাতান। হেপাটাইটিস সি থাবা বসায় তাঁর শরীরে। সারা দেহ হলুদ হয়ে যায়। দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হলেও, চিকিৎসায় সাড়া দেয় না সে। ২০২১ সালে ৮ মে কলকাতা একটি বেসরকারি হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়।
সুবিমল দাসের সঙ্গে তাতানের বাবা মানব বাগচীর পরিচয় বহু পুরনো। ২০১৬ সালে মানববাবু কলকাতায় একটি থিম প্যান্ডেল করতে এসে সিলিকনের জাদুকর সুবিমল দাসের সঙ্গে পরিচয় হয়। তাঁর হাতের কাজ তাঁকে মুগ্ধ করে। ভেবেছিলেন সময় সুযোগ মতো সুবিমলকে দিয়ে কিছু একটা করাবেন। কিন্তু, শেষ পর্যন্ত নিজের সন্তানের মূর্তি তৈরি করে নিয়ে বাড়ি ফিরতে হবে সেটা কোনওদিন স্বপ্নেও ভাবেননি।
প্রয়াত শিল্পী ছেলের স্মৃতিতে ঝাড়গ্রামে নিজের বাড়িতে ওপরের তলায় একটা মিউজিয়াম তৈরি করেছেন তিনি। যেখানে ছেলে এইভাবে বসে থাকবে, সেখানে চলবে ছেলের গান। থাকবে তাঁর লেখা বই সহ সার্ণবের যাবতীয় কাজ। চলতি মাসের শেষের দিকেই অর্থাৎ ২৩ মে তাতানের জন্মদিন, সেইদিনই জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হবে সেই মিউজিয়াম। সেখানে সার্ণব ছাড়াও আরও কয়েকটি ফাইবারের মূর্তি থাকবে। যেখানে ঝাড়গ্রামের অর্থাৎ জঙ্গলমহলের কালচার তুলে ধরা হবে।
মানুষের হারানো পরমাত্মীয়কে ফিরিয়ে দেওয়ার কাজ করতে করতে সুবিমল নিজেও মাঝে মাঝে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ছেন। পাশাপাশি এই কাজে যে তিনি সাফল্য অর্জন করতে পারছে তা এই পরিবারের খুশি চোখেমুখে দেখলেই বুঝতে পারছেন।আজ এই কাজের দৌলতে পৃথিবীর বহু প্রান্তে সুবিমল দাসকে এখন মানুষ চেনেন। দেশ ছাড়িয়ে বিদেশ থেকেও আসছে এমন অর্ডার। সিলিকনের মূর্তি তৈরিতে এখন বিরাটিতে সুবিমল দাসের ওয়ার্কশপে লাইন পড়েছে তা বলাই যায়।
