Malda News : পেল্লাই! হাতির পায়ের সাইজের লুচি – luchis the size of an elephant foot are found in malda


মানস রায়, মালদা

গরম গরম ফুলকো লুচি, কতই বা সাইজ তার? বাঙালি বাড়ির ময়দার লুচি বড়জোড় চার ইঞ্চি। আটার পুরি কিংবা রাধাবল্লভী আবার সাইজে তার চেয়ে সামান্য কম বা বেশি। আছে পুঁচকে ক্লাব কচুরি কিংবা কিংবদন্তি হয়ে যাওয়া গুটকে কচুরি। রয়েছে বেশ বড় সাইজের ডালপুরি কিংবা নানপুরিও। দিল্লির সিগনেচার ডিশ চানা-বাটোরায় চানার সঙ্গে যে বাটোরা থাকে, তা অবশ্য এদের সবার চেয়ে বড়।

কিন্তু জানেন কি তার চেয়েও বড় আকারের লুচি রয়েছে এই বাংলাতেই? যা দেখলে আপনি বলতে বাধ্য, সাইজ ডাজ ম্যাটার! হাতির পায়ের সাইজের একেকটা লুচি! নাম তাই হাতিপায়া। পাওয়া যায় মালদায়। জেলার বাইরে তেমন প্রচার নেই অবশ্য। একেকটা হাতিপায়া লুচি কম করে ১২ ইঞ্চি। অর্থাৎ কিনা সাধারণ লুচির তিন গুণ। একটা হাতিপায়া দিয়ে ঢেকে দেওয়া যায় গোটা একটা ভাতের প্লেট।

Jalebi : প্যাঁচে প্যাঁচে রস! কেঞ্জাকুড়ায় সুপারহিট ‘জাম্বো জিলিপি’, কীভাবে হয় জানেন?
তবে কেবল আকারেই নয়, লোকাল মানুষজন রসিকতা করে বলে থাকেন, ওজনেও হাতিপায়া প্রায় হাতিরই তুল্য। এক কেজি আটা বা ময়দায় সাধারণত যেখানে ৩০-৩৫টা লুচি তৈরি হয়, সেখানে এক কেজি পূর্ণিয়া আটা থেকে হাতিপায়া হয় মাত্র ৮টা। এই পূর্ণিয়া আটাও হাতিপায়াকে অন্য বড় সাইজের লুচির থেকে আলাদা করে।

এ তো গেল আকার আর ওজনের গল্প। তবে আরও একটি বিষয়ে হাতিপায়া সবার চেয়ে আলাদা। এ লুচির সঙ্গে যোগ রয়েছে মৃত্যুর। আরও নির্দিষ্ট করে বললে, একটি শ্মশানের। মালদা জেলায় ইংরেজবাজার থানার সদুল্লাপুর অন্যতম পুরোনো শ্মশান। সেখানেই পাওয়া যায় বিশাল আকারের এই লুচি। সদুল্লাপুর শ্মশানে মৃতদেহ সৎকার করতে গেলে মুখাগ্নি করে ফিরে মুখে দিতে হয় হাতিপায়া। তার আগে থালায় সাজিয়ে বিদেহি আত্মার উদ্দেশে নিবেদনও করতে হয়।

এর পর শ্মশানযাত্রীরা মিলে খান বিরাট এই লুচি। অনুষঙ্গ হিসেবে আলুর ঘ্যাঁট, চাটনি, বোঁদে। এরাই হাতিপায়ার আদি সঙ্গত। কালক্রমে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শুকনো লঙ্কাভাজা এবং রসগোল্লা। মৃতদেহ নিয়ে এসে সৎকারের আয়োজনের শুরু হতেই দলের কেউ একজন এসে শ্মশানযাত্রীর সংখ্যাটা জানিয়ে যান। দোকানে। সেই মতো আয়োজন শুরু করেন কর্মীরা। তবে সৎকার সেরেই কিন্তু খাওয়া নয়।

Vishwakarma Puja 2023: শিল্প আনতে স্পেনে মুখ্যমন্ত্রী, বিশ্বকর্মা পুজোর আগেই রাজ্যে ঝাঁপ পড়ল আরও এক জুটমিলে
যিনি মুখাগ্নি করলেন, তিনি ভাগীরথীতে ডুব দিয়ে এলে দোকানি সব পদ একটা প্লেটে সাজিয়ে ধূপকাঠি জ্বালিয়ে তাঁর হাতে তুলে দেন। সেটা নিয়ে নদীর ধারে গিয়ে প্রয়াতজনের উদ্দেশে অর্পণ করা হয়। এর পর শ্মশানযাত্রীরা মিলে খান হাতিপায়া। বছর খানেক ধরে হাতিপায়া লুচি, আলুর তরকারি, চাটনি, বোঁদে ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

রসগোল্লা অবশ্য পিস প্রতি দাম নেওয়া হয়। সঙ্গে শুকনো লঙ্কাভাজা ফ্রি। এতো গেল পাইকারি দাম। আর নেহাতই কেউ যদি শখে ঘুরতে গিয়ে হাতিপায়া চেখে দেখতে চান, মানে খুচরো খদ্দের হন, তাহলে তরকারি, চাটনি সমেত একটা লুচির প্লেট ২৫ টাকা দাম পড়ে। সদুল্লাপুর শ্মশান চত্বরে এখন হাতিপায়া লুচির দোকান ৫টা। এর মধ্যে শ্মশানের পাশের রাস্তার দু’ধারে অশ্বিনী দাসের দোকান ও বিশ্বনাথ মিশ্রের দোকান দু’টি শতাব্দী প্রাচীন। এখন আর মূল প্রতিষ্ঠাতারা নেই, দোকানের হাতবদল হয়েছে।

Dakshin 24 Pargana : পাচার দু’জনের ১০ বছর, এক জনের ৭ বছর জেল
অশ্বিনী দাসের দোকান এখন সামলান অধীর সরকার। এই লাইনে ৩৫ বছরের কারিগর তিনি। তবে গুরু মানেন বাবুলাল দাসকে। যিনি ৮০ পার করে কয়েক বছর হলো মারা গিয়েছেন। তাঁর হাতে নাকি হাতিপায়া তৈরির জাদু ছিল। বাবুলাল দাসের কথা উঠতে কপালে হাত ঠেকালেন পুলক সরকারও। শ্মশানে ঢোকার রাস্তার ধারে তাঁর ‘মা মনসা লুচি ভাণ্ডার’ এলাকার সবচেয়ে চালু দোকান।

পুলকবাবু বললেন, ‘সাধারণ লুচি ভাজার জ্ঞান নিয়ে হাতিপায়া ভাজা যায় না। হাতিপায়ার জন্যে পূর্ণিয়া আটা মাখা, বেলা এবং ভাজার বিশেষ কায়দা আছে। সেটা গুরু ধরে লেগে থেকে শিখতে হয়। এই কাজটারই ওস্তাদ ছিলেন বাবুলাল কারিগর।’ কথার মাঝেই দোকানে এক ক্রেতা এসে বলে গেলেন, ‘৬৭ জন। লাইনে দুটো বডি আছে। হয়ে যাবে তো?’ পুলকবাবু ঘাড় নাড়ালেন। পরক্ষণেই হাঁক দিয়ে বললেন, ‘আটা রেডি কর।’ হাতে ঘণ্টা তিনেক সময় মাত্র। দোকানের কর্মীরা ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।

Taekwondo Championship : ‘জেদ’-এর জোরে তাইকোন্ডোয় স্বর্ণ পদক, অলিম্পিকের স্বপ্নে বুঁদ চাষির মেয়ে রেখা
নির্দেশ দিয়ে ফের শুরু করলেন পুলকবাবু। ‘ওস্তাদ চলে যাওয়ার পর এখন নতুন কেউ কাজে ঢুকলে আমিই শিখিয়ে পড়িয়ে নিই। আটা মাখা, বেলা, ভাজা, পরিবেশন করা সব মিলিয়ে অনেক কর্মী লাগে।’ ব্যস্ততার মাঝেই প্রশ্নটা ছুড়ে দেওয়া গেল, ‘কিন্তু এতো বড়ো সাইজের লুচি কেন?’ পুলকবাবু বললেন, ‘নইলে যে সামাল দেওয়া যাবে না। একেক দলে ৫০-৬০ জন, এমনকী, ১০০-১৫০ জন পর্যন্ত শ্মশানযাত্রী থাকতে পারেন। সবাই গরম গরম খাবেন। লুচি ছোট হলে একেক জনকে একবারে অন্তত ৪টে করে লুচি দিতে হবে। তাতে ওই ভিড় সামাল দিতে অনেক উনুন, কারিগর লাগবে। কিন্তু হাতিপায়া বড় হওয়ায় জন প্রতি একটা করে দিলে খেতে খেতে আবারও ভাজা হয়ে যায়।’

পুলকবাবু থামলেন। দোকানে হুড়মুড় করে শ্মশানযাত্রীরা ঢুকে পড়েছেন। ও দিকে, ১২ নম্বর সাইজের বিশাল লোহার কড়াই থেকে হাতিপায়াও একেক করে নামতে শুরু করেছে ততক্ষণে…



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *