Success Story,অজস্র বিপত্তি টপকে স্বপ্নের উড়ান ট্রান্স রীতিকা-আকাঙ্ক্ষার – success story of transgender ritika das and akanksha mandal


অনির্বাণ গুহ

ফ্ল্যাশব্যাক ২০১৭। এলাহাবাদ স্টেশনে ট্রেনটা সবে প্ল্যাটফর্মে ঢুকেছে। জনা চল্লিশের একটা দল, সবাই নৃত্যশিল্পী। বড়সড় একটা অনুষ্ঠানে অংশ নিতে উত্তরপ্রদেশে আসা। সেই মঞ্চে বলিউডের জনপ্রিয় শিল্পীরাও থাকবেন। এই পর্যন্ত সব ঠিকঠাক। ঝটকাটা তারপরই। কলকাতা থেকে রীতিমতো বরাত দিয়ে শিল্পীদের ওই অনুষ্ঠানের জন্য আনা হয়েছে। তবে প্ল্যাটফর্মে পা রাখতেই ছবিটা ধূসর হয়ে যাবে, এমনটা স্বপ্নেও ভাবেননি রীতিকারা!

আয়োজকরা ওঁদের কয়েকজনকে দেখেই বেঁকে বসলেন! কড়ি খসিয়ে লোকে বৃহন্নলা নাচ দেখতে আসবে নাকি! পত্রপাঠ টাটা, বাই-বাই-এর নির্দেশ। কাকুতি-মিনতি, অনুনয় পর্ব সেই শুরু। তাতে অতিথিশালা মিললেও স্টেজে এঁদের তোলা যাবে না। এল সাফ নির্দেশ। সন্ধে গড়াতেই কার্যত হাতে-পায়ে ধরা, তবুও না! টাকাপয়সা মিটিয়ে বাড়ি ফেরতের নিদান আয়োজকের।

সেই সময়েই ভাগ্যের ইউ-টার্ন। রাত ন’টা নাগাদ স্টেজে উঠলেন রীতিকারা। উঠেই তাক লাগিয়ে দেওয়া রাজস্থানের লোকনৃত্য। আয়োজকরা কার্যত ক্ষমার ভঙ্গিতে বলেছিলেন, ‘বড্ড ভুল হয়ে গিয়েছে, এই পারফরম্যান্স কল্পনাও করিনি।’

রীতিকা দাস। ট্রান্সজেন্ডার, এখন রূপান্তরিত। যতটা সহজে পরিচিতি হলো, জীবনের গ্রাফ ততটা সহজ নয়। সংক্ষেপে, বাধা টপকে মেলে ধরার সেলুলয়েড! ২০২২-এর মিস কলকাতা, মিস বিহার রানার আপ, ২০২১-এ মিস বাংলা (ট্রান্স) বা ৬৭ জন মহিলা প্রতিযোগীকে পিছনে ফেলে ‘দ্য গ্ল্যাম অফ দ্য ফেস’-এর প্রথম সারিতে। বাঘাযতীন বয়েজ় স্কুল থেকে পড়াশোনা। এডুকেশনে অনার্স। থাঙ্কমণি কুট্টির ঘরানায় ভরতনাট্যম শেখা। পরের পরিচিতিটা ছড়ায় লোকমুখে।

টেলিভিশনের পর্দায় পৌরাণিক শোয়ে পরিচিত মুখ। ভাগবত কথায় রীতিকার পারফরম্যান্স মোটিভেশনাল স্পিকার জয়া কিশোরীরও প্রশংসা কুড়িয়েছে। রীতিকা মডেলিংয়ের জগতেও প্রতিষ্ঠিত মুখ। যদিও হেনস্থার হালখাতা স্কুলজীবনের পর থেকেই। গঞ্জনার গলিপথও পেরোতে হয়েছে বহু।

চোখে জল আসে রীতিকার, ‘মডেলিংয়ের সময়েও পিছনের সারিতে যেতে হতো! আগে অন্য মেয়েদের মেক-আপ হবে, তারপর আমরা। প্রতিপদে তাচ্ছিল্য, আমরা যেন মানুষ নই!’ রাস্তা-ঘাটে টিটকিরি তো বটেই, লাঞ্ছনার শিকারও হতে হয়েছে। পুলিশ ডাকলেও উল্টে কথা শুনতে হয়েছে। অভিযুক্তদের আড়াল করেছে আইনরক্ষকরাই।

রীতিকার কথাগুলো কর্কশ শোনালেও আইনজীবী শৌভিক মুখোপাধ্যায়ের যুক্তি, ‘ওঁদের পাশে আমরাও দাঁড়াতে চাই। তবে বাস্তব হলো ১৮৬০-এর ভারতীয় দণ্ডবিধিতে শুধুমাত্র নারী, পুরুষ বা নারী সুরক্ষার কথা রয়েছে, তৃতীয় লিঙ্গের কোনও উল্লেখই নেই। ধরুন আইপিসি ৩৫৪-র (শ্লীলতাহানি) ক্ষেত্রে মেয়েদের আইনি সুরক্ষা দেওয়া আছে, তবে ট্রান্সজেন্ডার কোন আওতায় পড়বেন? পুলিশই বা কী কেস করবে? ফলে এ নিয়ে শীর্ষ আদালতকেই হস্তক্ষেপ করতে হবে। যেমনটা রূপান্তরকামীদের নিয়ে অনেক যুগান্তকারী রায় শীর্ষ আদালত দিয়েছে।’

Bhatpara Utsav 2024 : নাচের অনুষ্ঠানের পরেই আচমকা লুটিয়ে পড়লেন যুবক, ভাটপাড়া উৎসবে রহস্যমৃত্যু নৃত্যশিল্পীর
আসলে বাঘাযতীনের রীতিকাই হোক বা বারুইপুরের আকাঙ্ক্ষা মণ্ডল, যিনি ট্রান্সদের স্বাবলম্বী করতে রেস্তরাঁ চেইন গড়ার স্বপ্ন নিয়ে ছুটছেন উত্তরপ্রদেশ। বা বহরমপুরের ইংরেজির স্নাতক কাঞ্চনা রায়, রবীন্দ্রনৃত্যে ডিপ্লোমা। ওঁরা ট্রান্সজেন্ডার তকমা থেকে বেরিয়ে এসে সমাজে নিজের নাম প্রতিষ্ঠিত করেছেন কার্যত প্রচার ছাড়াই। বোলপুরের আলিশা রাজবংশী তো ইতিহাসে স্নাতকের গণ্ডি পেরোতে পারেননি! যার ষোলোআনার মধ্যে চোদ্দোআনাই সামাজিক গঞ্জনায়।

কলেজে যাঁকে বিবস্ত্র করে বাকিরা বুঝতে চেয়েছিল, তৃতীয় লিঙ্গের শারীরিক গঠন! এখন ‘আলোর দিগন্ত’ নামের সংগঠন গড়ে অসহায় ট্রান্সদের পাশে দাড়িয়ে জেলায় পরিচিত মুখ। রীতিকার ধ্রুপদী নৃত্যগোষ্ঠী ‘রীতিকা ডান্স ট্রুপ’ বা কাঞ্চনার রবীন্দ্রনৃত্যের দল, ‘উড়ান’ আজ প্রসংশা পাচ্ছে। আসলে বাধা টপকে ওঁরা যথার্থ অর্থেই আজ অ্যাচিভার। ছায়াসূর্যের আকাশে রীতিকাদের উড়ান সত্যি সত্যিই ডানা মেলেছে।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *