বর্ধমানেই মহাভারত? রাজা পাণ্ডুর ‘ঢিবি’র নীচে ঘুমিয়ে হাজার-হাজার বছরের ইতিহাস? বিস্ময়কর খনন-কথা…। Pandu Rajar Dhibi Excavation of Pandu Rajar Dhibi astonishing revealations of history purana kavya king pandu of epic mahabharata


অরূপ লাহা: কেন্দ্রের উদাসীনতা! অবহেলিত পাণ্ডুরাজার ঢিবি (Pandu Rajar Dhibi) বাঁচাতে ফের আন্দোলনের ডাক লেখক রাধামাধব মণ্ডলের। “পাণ্ডুরাজার ঢিবির নীচে লুকিয়ে থাকা প্রাচীন সভ্যতার ইতিহাস (History of Civilization) সামনে এলে ভারতবর্ষের ইতিহাস (Indian History) সম্পর্কে ধারণাই বদলে যাবে।” বলছিলেন ‘পাণ্ডুরাজা প্রত্নগবেষণা কেন্দ্রে’র প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক, লেখক রাধামাধব মণ্ডল। 

আরও পড়ুন: Sea Nomads: জলযাযাবর! জলেই জন্ম, ঢেউয়েই জীবন, স্রোতেই মৃত্যু! কোন মন্ত্রে জলের নীচে শ্বাস নিয়ে বছরের পর বছর বেঁচে থাকে এরা?

পাণ্ডুরাজা উৎসব

স্থানীয় মানুষদের  সঙ্গে নিয়ে লেখক রাধামাধব মণ্ডল এই আন্দোলন করেছেন। অথচ, তাঁর দীর্ঘদিনের দাবি সত্ত্বেও গবেষণার কাজ কিছুই এগোয়নি। নেই যথেষ্ট পরিকাঠামোও। তাই রীতিমতো ধুঁকছে পৃথিবীর প্রাচীনতম প্রত্নক্ষেত্রগুলির একটি– এই বর্ধমানের পাণ্ডুরাজার ঢিবি। প্রায় সিন্ধু সভ্যতার সমসাময়িক এই প্রত্নক্ষেত্রকে বাঁচানোর দাবিতে বহুবার সরকারি দফতরে আবেদন জানানো হয়েছে। তার পর অবশেষে আন্দোলনের ডাক দিলেন পাণ্ডুরাজা প্রত্ন গবেষণা কেন্দ্রের সম্পাদক লেখক রাধামাধব মণ্ডল। তিনি প্রত্যেক বছর বাংলা ও বাঙালির গর্বের এই ইতিহাসক্ষেত্রটিকে নিয়ে পঞ্চমদোলের সময় তিনদিনের পাণ্ডুরাজা উৎসব করেন। সেখান থেকে প্রত্যেক বছর একজন বাংলার কৃতী মানুষকে সম্মানিত করা হয়। মহাশ্বেতা দেবীর পাশাপাশি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, মোহিনীমোহন গঙ্গোপাধ্যায়, সৈয়দ কওসর জামাল, লীনা গঙ্গোপাধ্যায়কে এই সম্মান দেওয়া হয়েছে। 

আউশগ্রামের জঙ্গলে

পূর্ব বর্ধমানের আউশগ্রামের জঙ্গলমহলের রামনগরের পাণ্ডুক গ্রামের রসফাল্লা পুকুরপারের এই জমিটি স্থানীয়ভাবে ‘রাজাপোতা’ নামে পরিচিত। এর পাশেই রয়েছে প্রাচীন পাণ্ডুক গ্রাম। ১৯৬২ সালে প্রত্নতাত্ত্বিক পরেশনাথ দাশগুপ্ত প্রথম এই অঞ্চলে খননকার্য শুরু করেন। ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত মোট ৪ বার খননকার্য চলে। কিন্তু এরপর নকশাল আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে খননকার্য চালানো যায়নি। ১৯৮৫ সালে আর একবার খননকার্য চালানো হয়। এরপর থেকেই পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে পাণ্ডুরাজার ঢিবি। জায়গায় জায়গায় গজিয়ে উঠেছে আগাছা। কাঁটাতারের বেড়া থেকে শুরু করে প্রাচীর, সবই ভেঙে পড়েছে। এই বিষয়ে পুরাতত্ত্ব বিভাগের কাছে বারবার আবেদন জানানোর পরেও কাজ এগোয়নি।

ভারতীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগ

কয়েক বছরের আন্দোলনে পাণ্ডুরাজার ঢিবিতে পাঁচিল দেওয়ার কাজ করেছে ভারতীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগ। এবার তারপর আবার নিস্তব্ধতা। তাই চলতি মাস (জুলাই) থেকেই ফের শুরু হয় আন্দোলনের প্রস্তুতি। পুজোর আগে বিরাট জনমত তৈরি করে হবে বাংলা ও বাঙালির ইতিহাসক্ষেত্র বাঁচাও আন্দোলন। বারবার আন্দোলন করলে তখন ভারতের পুরাতত্ত্ব বিভাগের তরফ থেকে প্রতিনিধিরা এসে ঘাস কাটার কাজ শুরু করেছিলেন। যদিও রাধামাধববাবু তখনই জানিয়েছিলেন, “ঘাস কেটে আমাদের মুখ বন্ধ করার চেষ্টা চলছে। কিন্তু প্রকৃত সংরক্ষণের কাজ না এগোলে আমরা বৃহত্তর লড়াইয়ের পথেই যাব।” ইতিমধ্যে সংরক্ষণের কাজ আর কিছুই এগোয়নি। পুরাতত্ত্ব বিভাগের কর্মী আব্দুল মালেকও স্বীকার করেছেন এই অব্যবস্থার কথা। এখন আবার সেই একই অবস্থা। তাই এবার পুরাতত্ত্ব বিভাগের রাজ্য শাখার পাশাপাশি কালনা অঞ্চলের সিও এবং প্রধানমন্ত্রীর কাছেও অভিযোগ জানিয়ে চিঠি পাঠিয়েছে ‘পাণ্ডুরাজা প্রত্ন গবেষণা কেন্দ্র’। 

আরও পড়ুন: Two Deadly Storms: এবার মহাসাগরের বুকে চোখ পাকাচ্ছে ভয়াল দুই ঘূর্ণিদানব! কবে, কোথায়, কখন আছড়ে পড়বে এই জোড়া দুর্যোগ?

রাধামাধব মণ্ডলের দাবি

আন্দোলনকারীদের প্রধান লেখক রাধামাধব মণ্ডলের দাবি, এলাকার সংরক্ষণের পাশাপাশি এখান থেকে উদ্ধার হওয়া সমস্ত প্রত্নসামগ্রী নিয়ে একটি সংগ্রহশালাও তৈরি করতে হবে। তাছাড়া, ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত ড. বিবি লালের খননকার্যের রিপোর্ট অনুযায়ী, এলাকার ৮৫ শতাংশ খননকার্য এখনও বাকি থেকে গিয়েছে। দ্রুত সেই কাজ শুরু করার দাবিও রেখেছেন তিনি। প্রসঙ্গত, লেখক রাধামাধব মণ্ডলদের উদ্যোগে একটি ছোট সংরক্ষণশালা তৈরি করা হয়েছে এলাকায়। 

বাংলার গৌরব ও গরিমা

আন্দোলনকারীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন বর্ধমান বিশ্বাবিদ্যালয়ের প্রাক্তন চিত্রবীথি ও সংরক্ষণশালার অধ্যক্ষ ড. রঙ্গনকান্তি জানা। তাঁর কথায়, “পাণ্ডুরাজার ঢিবি বাঙালিদের কাছে, প্রাচীনত্বের গৌরবগাথা। তাকে ঘিরে বাংলার গৌরব ও গরিমা জড়িয়ে রয়েছে।” আন্দোলনে সঙ্গী হয়েছেন একসময় পাণ্ডুরাজার ঢিবিতে খননে যুক্ত শ্রমিক উল্লাসপুর গ্রামের বাসিন্দা ভক্তিপদ মেটে। তিনি বলেন, ‘আমরা পরেশবাবুর সঙ্গে খননে জড়িয়ে ছিলাম। কাজ করেছি। তিনি বলতেন, এখানে বাঙালির ইতিহাস চাপা আছে। অথচ কেন্দ্র সরকার কিছু করছে না।’ রাজ্য পুরাতত্ত্ববিভাগের প্রধান বলেন, “বাংলার ইতিহাসক্ষেত্র শুধু নয়, দেশ বিদেশের ইতিহাসক্ষেত্রের আলোচনাতেও পাণ্ডুরাজার ঢিবির কথা উঠে আসে আজও। একই স্থানে একাধিক সভ্যতা আবিষ্কৃত হয়েছে। তার মধ্যে প্রাগৈতিহাসিক যুগের নিদর্শন গুলি এখনও অজানার অন্ধকারে রেখেছে বিজ্ঞানীদের।” যদিও কবে তার অনুসন্ধান হবে, তা নিয়ে কিছু বলতে চাননি তিনি। আন্দোলনের পথে শেষ পর্যন্ত সাফল্য মেলে কি না, আপাতত সেটাই দেখার। পাণ্ডুরাজার ঢিবি অবহেলায় আর অযত্নে হারিয়ে গেলে বাংলা তো বটেই, ভারতের ইতিহাসের একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় অজানাই থেকে যাবে। 

(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, লাইফস্টাইল স্বাস্থ্য, প্রযুক্তির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের AppFacebookWhatsapp ChannelX (Twitter)YoutubeInstagram পেজ-চ্যানেল)





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *