রাজ্যে দেখা দিয়েছে নিপা ভাইরাসের আতঙ্ক । খেজুর গুড় খাওয়ার আগে সাবধান । খেজুর গাছের ডগায় খোলামুখ মাটির হাঁড়ি বা কোটা বেঁধে দেওয়া হয় । সারা দিন রাত সেইভাবেই খোলামুখ পাত্রে খেজুর রস সংগ্রহ হয় । সেই খোলা মুখ পাত্রে বসছে বাদুড়, বিভিন্ন প্রজাতির পাখি, পড়ছে পোকা মাকড় । সেই পাত্রগুলি পালক, পাখি – পোকা মাকড়ের মলে ভর্তি । সেই পাত্র থেকেই খেজুর সংগ্রহ করে আগুনে ফুটিয়ে তারপর সেই গুড় প্রস্তুত করা হয়। সেই গুড় জেলার বিভিন্ন প্রান্তে, ভিন জেলা এবং ভিন রাজ্যেও রপ্তানি করা হয়। হাটে বাজারে অবাধে বিকোচ্ছে সেই গুড়। যা থেকে নিপা ভাইরাসের সংক্রমন ছড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে । পুরুলিয়ার জেলার বিভিন্ন প্রান্তেই এইভাবে খেজুর রস সংগ্রহ করে গুড় তৈরি করে বিক্রি করা হচ্ছে ।
শীতকাল এলেই বাংলার মানুষের মধ্যে খেজুরের রস খাওয়ার চল বেড়ে যায়। অনেকে গাছ থেকে খেজুরের কলসি নামিয়ে সরাসরি কাঁচা রস খেয়ে থাকেন।আবার অনেকে এই রস গ্যাসে ফুটিয়ে সিরাপ, পায়েস বা ক্ষীর বানিয়ে খান। এছাড়া রসের তৈরি ঝোলা গুড়, পাটালি গুড়, নলেন গুড়, ভেলি গুড়, বালুয়া গুড়, মিছরি গুড়সহ নানা ধরণের পিঠার বেশ সুখ্যাতি রয়েছে।
নিপা ভাইরাস আতঙ্ক
খেজুর আরব দেশের প্রচলিত ফল হলেও ওইসব দেশে খেজুর, মূলত ফল উৎপাদননির্ভর, যেখানে কিনা বাংলার খেজুর গাছ রস উৎপাদননির্ভর। কৃষি তথ্য সার্ভিসের মতে, বাংলার সাধারণত কার্তিক থেকে মাঘ অর্থাৎ অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত খেজুরের রস সংগ্রহ হয়ে থাকে।
মূলত খেজুর গাছের ডালপালা পরিষ্কার করে, ডগার দিকের কাণ্ড চেঁছে তাতে একটা বাঁশের কঞ্চি দিয়ে তৈরি চোঙ বসিয়ে দেয়া হয়। চোঙের শেষ প্রান্তে ঝুলিয়ে দেয়া হয় একটি মাটির হাড়ি বা কলসি। সেই চোঙ দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা রস এসে জমা হতে থাকে মাটির হাড়ি বা কলসিতে। এভাবে একটি গাছ থেকে দৈনিক গড়ে পাঁচ থেকে ছয় লিটার রস সংগ্রহ করা যায় বলে কৃষি তথ্য সার্ভিস সূত্রে জানা গিয়েছে। কিন্তু গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এই খেজুরের রস খাওয়ার ক্ষেত্রে নিপা ভাইরাস আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।
খেজুরের রস খেতে সতর্কতা:
নিপা ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে কোন টিকা বা কার্যকর চিকিৎসা নেই। এ কারণে খেজুরের রস খাওয়া বন্ধ করে দেবেন, বিষয়টা তা নয়, এক্ষেত্রে কিছু বিষয়ে সতর্ক হলেই হবে। প্রথমত রস সংগ্রহ ও সংরক্ষণের সময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার দিকে মনোযোগ দিতে হবে। চেষ্টা করতে হবে দ্রুত রস বিতরণ করার এবং ঢেকে রাখার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ভাইরাস থেকে নিস্তার পাওয়ার প্রধান উপায় হল গাছগুলোর রস সংগ্রহের জায়গায় প্রতিরক্ষামূলক আবরণ বা স্যাপ স্কার্ট ব্যবহার করা, যেন বাদুড় এর সংস্পর্শে আসতে না পারে।
স্যাপ স্কার্ট হল, বাঁশ, কাঠ, ধইঞ্চা, পাটের খড়ি বা পলিথিন দিয়ে বানানো বেড়া। যেটা রসের নিঃসরণের চোঙের মাথা থেকে কলসির মুখ পর্যন্ত পুরোটা গাছের সাথে বেঁধে ঢেকে রাখা।
কলসির মুখে ঢাকনার ব্যবস্থাসহ রসের উৎস মূল ঘিরে নাইলনের জাল দিয়ে বেষ্টনী দিতে হবে।
তবে আইসিডিডিআর’বির গবেষকরা গোপন ক্যামেরার মাধ্যমে দেখতে পেয়েছেন যে, রসের হাড়ির চারপাশ জাল বা এমন স্যাপ স্কার্ট দিয়ে ঢেলে দিলেও বাদুর কলসির মুখ বরাবর প্রস্রাব করে। ওই বেড়া দিয়ে বাদুড়ের রস খাওয়া প্রতিরোধ করা গেলেও ওই প্রস্রাবের গতি ঠেকানো যায় না। ফলে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।
কাঁচা খেজুর রস পান করা একটি সংস্কৃতি হলেও, জীবন রক্ষার্থে রস সিদ্ধ করে পান করা নিরাপদ।
স্বাস্থ্য দপ্তরের বলছে, কাঁচা রস পান করা মোটেও নিরাপদ নয়। এক্ষেত্রে রসটি ফুটিয়ে খেলে ঝুঁকিমুক্ত থাকা সম্ভব।
রস সংগ্রহের পর আগুনে ৭০-৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপে কিছু উত্তপ্ত করলেই ভাইরাস মরে যাবে।
খেজুরের রস এতটা নিয়ম ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার সাথে সংগ্রহ করা হয়েছে কিনা সেটা নিশ্চিত হওয়া জরুরি এজন্য নিজে গিয়ে না হলে বিশ্বস্ত সূত্রে রস সংগ্রহ করতে হবে। খেজুরের রস বিশ্বস্ত কারও থেকেই নেওয়া ভাল। যারা এসব বিষয়ে সচেতন।
এছাড়া গাছ থেকে ঝরে পড়া ফল কিংবা গাছে ধরা ফল খাওয়ার আগে ফলগুলি ভালভাবে ধুয়ে এবং খোসা ছাড়িয়ে নেওয়া উচিৎ। বাদুড়ের কামড়ের চিহ্ন দেখতে পেলে সেই ফল সাথে সাথে ফেলে দিতে হবে।
রস সংগ্রহের স্থান থেকে বাদুড়কে দূরে রাখা সহায়ক হতে পারে। কিন্তু বাদুড় অনেক দূর দূরান্ত পর্যন্ত উড়তে পারে। তাই এই উপায় খুব একটা কাজে দেবে না বলছেন, মিজ ফ্লোরা। এক শ্রেণির রস বিক্রেতা খাঁটি রসের সঙ্গে পানিসহ অন্যান্য তরল মিশিয়ে এর পরিমাণ ও স্বাদ বাড়ানোর অপচেষ্টা করে। তাই খেজুর রস পান করার সময় এর স্বাদ ও খাঁটি কি-না তা পরীক্ষা করা দরকার।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, লাইফস্টাইল স্বাস্থ্য, প্রযুক্তির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের App, Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)
