অর্কদীপ্ত মুখোপাধ্যায়: ভোটার তালিকায় নাম সংশোধন ও এসআইআরে, পরিচয়পত্র হিসেবে মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ড (Madhyamik Admit Card) আর বৈধ নয়, কড়া সিদ্ধান্ত নির্বাচন কমিশনের (Election Commission)। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে বর্তমানে রাজ্যে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনী (SIR) এবং নথি যাচাইয়ের কাজ পুরোদমে চলছে। কিন্তু এই প্রক্রিয়া চলাকালীনই এক চাঞ্চল্যকর নির্দেশিকা জারি করল ভারতের নির্বাচন কমিশন। ভোটার তালিকায় নাম তোলা বা সংশোধনের ক্ষেত্রে বয়সের প্রমাণ হিসেবে মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ডকে (Madhyamik Admit Card) বৈধ নথি হিসেবে গ্রহণ করার যে প্রস্তাব রাজ্য সরকার দিয়েছিল, তা সরাসরি খারিজ করে দিয়েছে কমিশন।
রাজ্য সরকারের প্রস্তাব ও কমিশনের প্রত্যাখ্যান
ভোটার তালিকায় স্বচ্ছতা আনতে এবং নির্ভুল তালিকা তৈরি করতে নির্বাচন কমিশন নিয়মিত শুনানি ও নথি যাচাই প্রক্রিয়া চালাচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় লক্ষ লক্ষ ভোটারকে তাঁদের উপযুক্ত পরিচয়পত্র ও ঠিকানার প্রমাণ জমা দিতে হচ্ছে। সাধারণ মানুষের সুবিধার কথা মাথায় রেখে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল যে, মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ডকে যেন বৈধ পরিচয়পত্র বা বয়সের প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা হয়।
বৃহস্পতিবার নির্বাচন কমিশনের আন্ডার সেক্রেটারি শক্তি শর্মার সই করা একটি চিঠি রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের (CEO) দফতরে এসে পৌঁছায়। সেই চিঠিতে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, রাজ্যের এই প্রস্তাব ‘গ্রহণযোগ্য নয়’। কমিশনের যুক্তি অনুযায়ী, গত ২৭ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে এসআইআর (SIR) সংক্রান্ত যে বিস্তারিত নির্দেশিকা জারি করা হয়েছিল, সেখানে কোন কোন নথি গ্রহণযোগ্য হবে তার একটি নির্দিষ্ট তালিকা দেওয়া আছে। সেই তালিকায় মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ডের কোনো উল্লেখ নেই। ফলে পূর্বনির্ধারিত তালিকার বাইরে গিয়ে নতুন কোনো নথিকে স্বীকৃতি দিতে নারাজ কমিশন।
ভোগান্তির আশঙ্কায় সাধারণ মানুষ ও প্রশাসনিক মহল
প্রশাসনিক মহলের মতে, নির্বাচন কমিশনের এই অনমনীয় সিদ্ধান্তের ফলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কয়েক গুণ বেড়ে যেতে পারে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় বা নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোতে জন্ম শংসাপত্রের পর সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ এবং সহজলভ্য বয়সের প্রমাণপত্র হলো মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ড। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ভোটার কার্ড তৈরি বা সংশোধনের ক্ষেত্রে এই নথিটিই বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
এখন থেকে নতুন ভোটার হতে চাওয়া তরুণ-তরুণীদের ক্ষেত্রে আধার কার্ড, ডিজিটাল জন্ম শংসাপত্র বা পাসপোর্টের মতো নথির ওপরই সম্পূর্ণ নির্ভর করতে হবে। যাঁদের কাছে এই ডিজিটাল নথিগুলি নেই বা যে নথিতে ত্রুটি আছে, তাঁদের জন্য ভোটার তালিকায় নাম তোলা এখন এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াল।
কেন এই কঠোর অবস্থান কমিশনের?
নির্বাচন কমিশনের দাবি, ভোটার তালিকা সংশোধনের ক্ষেত্রে সারা দেশে একটি অভিন্ন ও কঠোর নিয়ম বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।
কমিশনের মতে:
একই নিয়ম: ভারতের প্রতিটি রাজ্যে যেন একই ধরনের নথি যাচাইয়ের পদ্ধতি থাকে, তা নিশ্চিত করা। কোনো রাজ্যে একটি নথি গ্রাহ্য হবে আর অন্য রাজ্যে হবে না—এমন বৈষম্য দূর করাই তাঁদের লক্ষ্য।
স্বচ্ছতা ও নির্ভুলতা: ২০২৬-এর নির্বাচনের আগে একটি ১০০ শতাংশ নির্ভুল ভোটার তালিকা তৈরি করতে চায় কমিশন। তাঁদের মতে, ডিজিটাল ডেটাবেস যুক্ত নথি (যেমন আধার বা কিউআর কোড যুক্ত জন্ম শংসাপত্র) যাচাই করা যতটা সহজ, পুরোনো ধাঁচের অ্যাডমিট কার্ড যাচাই করা ততটা নিখুঁত নাও হতে পারে।
পূর্বনির্ধারিত তালিকা: ২০২৫ সালের ২৭ অক্টোবরের নির্দেশিকায় যে তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে, আইনি কারণে তার বাইরে গিয়ে হুট করে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে চাইছে না কমিশন।
বর্তমান পরিস্থিতির প্রভাব
এসআইআর (SIR) বা বিশেষ নিবিড় সংশোধনী প্রক্রিয়ায় এখন বাড়ি বাড়ি গিয়ে বা শিবিরের মাধ্যমে নথি যাচাই চলছে। বহু মানুষ ইতিপূর্বেই মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ড জমা দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। কমিশনের এই ‘নবতম সংযোজন’ বা নতুন নির্দেশিকার ফলে তাঁদের এখন বিকল্প নথির সন্ধানে দৌড়ঝাঁপ করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সিদ্ধান্তের ফলে প্রথমবার ভোটার হতে চাওয়া (First-time Voters) পড়ুয়াদের মধ্যে একটি বড় অংশ সমস্যায় পড়তে পারেন। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই স্কুল থেকে প্রাপ্ত অ্যাডমিট কার্ডকেই তাঁরা তাঁদের প্রধান পরিচয়পত্র হিসেবে গণ্য করেন। এখন সেই বিকল্প বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আবেদন বাতিলের হার বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আগামী বিধানসভা নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা পরিমার্জনের এই কাজ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একদিকে কমিশন যখন ‘স্বচ্ছতা’ এবং ‘অভিন্নতা’র কথা বলছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের ‘সহজলভ্যতা’ ও ‘হয়রানি’র প্রশ্নটিও প্রকট হয়ে উঠছে। মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ডের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ নথি বাতিলের এই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক মহলেও বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এখন দেখার, রাজ্য সরকার পুনরায় এই বিষয়ে কোনো আপিল করে কি না, নাকি সাধারণ মানুষকে বিকল্প নথির পথেই হাঁটতে হয়।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, লাইফস্টাইল স্বাস্থ্য, প্রযুক্তির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের App, Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)
