জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশন (WBSSC) নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখতে এক নজিরবিহীন ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ২০১৬ সালের নিয়োগ দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত এবং ‘অযোগ্য’ হিসেবে চিহ্নিত প্রার্থীরা ২০২৫ সালের নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু কমিশনের তৎপরতায় সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে কমিশন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ২০১৬ সালের সেই ‘টেইন্টেড’ বা কালিমালিপ্ত প্রার্থীরা আর নতুন করে পরীক্ষায় বসার সুযোগ পাবেন না।
প্রযুক্তির সাহায্যে অযোগ্যদের চিহ্নিতকরণ
কমিশন সূত্রে খবর, এবার আবেদন যাচাইয়ের ক্ষেত্রে অত্যন্ত আধুনিক ‘সিস্টেম বেসড চেক’ বা প্রযুক্তিনির্ভর যাচাইকরণ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। ২০১৬ সালের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় (১ম এসএলএসটি এবং ৩য় আরএলএসটি) যাদের নাম অবৈধ উপায়ে চাকরি প্রাপকদের তালিকায় ছিল, সেই ডেটাবেসের সঙ্গে ২০২৫ সালের (২য় এসএলএসটি/এনটিএস) আবেদনকারীদের তথ্য মিলিয়ে দেখা হয়। এই ক্রস-ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়ায় দেখা যায়, বহু অযোগ্য প্রার্থী ফের চাকরির জন্য আবেদন করেছেন। সঙ্গে সঙ্গেই তাদের চিহ্নিত করে বাতিল বা ‘রিজেক্ট’ করা হয়েছে।
বাতিলের পরিসংখ্যান ও কারণ
কমিশনের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গ্রুপ সি এবং গ্রুপ ডি—উভয় বিভাগেই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রার্থীর আবেদন খারিজ করা হয়েছে। বাতিলের তালিকায় প্রার্থীদের অ্যাপ্লিকেশন আইডি, নাম এবং ২০১৬ সালের রোল নম্বর উল্লেখ করা হয়েছে। বাতিলের কারণ হিসেবে স্পষ্টভাবে লেখা হয়েছে—”Rejection being tainted candidate in respect of 3rd RLST 2016 (NT)”.
বাতিল হওয়া প্রার্থীদের পরিসংখ্যান নিম্নরূপ:চাকরির সুযোগ
গ্রুপ ডি (চতুর্থ শ্রেণীর কর্মী): মোট ২৮৮ জন প্রার্থীর আবেদন বাতিল করা হয়েছে।
গ্রুপ সি (ক্লার্ক): মোট ২৫৬ জন প্রার্থীর নাম বাতিল করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে ৫৪৪ জন এমন প্রার্থীকে আটকে দেওয়া হয়েছে যারা পূর্ববর্তী নিয়োগে অসদুপায় অবলম্বন করেছিলেন।
অ্যাডমিট কার্ড ও ভবিষ্যৎ সতর্কতা
কমিশন কড়া ভাষায় জানিয়েছে, এই বাতিল হওয়া প্রার্থীদের কোনওভাবেই অ্যাডমিট কার্ড দেওয়া হবে না। যদি যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ভুলবশত কারও নামে অ্যাডমিট কার্ড ইস্যু হয়েও থাকে, তবে তা ‘বাতিল’ বা অবৈধ বলে গণ্য হবে এবং পরীক্ষাকেন্দ্রে তাদের প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।
শুধু তাই নয়, নিয়োগ প্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপগুলোতেও যদি অন্য কোনও প্রার্থীর বিরুদ্ধে ২০১৬ সালের দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া যায় বা তাদের নাম অযোগ্যদের তালিকায় থাকে, তবে যেকোনো মুহূর্তে তাদের প্রার্থিতা খারিজ করার পূর্ণ অধিকার কমিশনের হাতে রয়েছে। কমিশনের এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে নিয়োগ দুর্নীতি রোধে একটি বড় বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নিয়োগে স্বচ্ছতার নতুন দিগন্ত: ‘কালিমালিপ্ত’ ৫৪৪ প্রার্থীর আবেদন বাতিল করল স্কুল সার্ভিস কমিশন
বাংলার শিক্ষা ক্ষেত্রে নিয়োগ প্রক্রিয়াকে কলঙ্কমুক্ত করতে এক নজিরবিহীন ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করল পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশন (WBSSC)। অতীতে নিয়োগ দুর্নীতির ছায়া কাটিয়ে উঠতে এবং যোগ্য প্রার্থীদের অধিকার সুরক্ষিত করতে এবার প্রযুক্তির বর্ম ব্যবহার করল কমিশন। ২০১৬ সালের বিতর্কিত নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ‘অযোগ্য’ বা ‘টেইন্টেড’ (Tainted) হিসেবে চিহ্নিত হওয়া ৫৪৪ জন প্রার্থী ২০২৫ সালের নতুন নিয়োগ পরীক্ষায় বসার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু কমিশনের তৎপরতায় সেই প্রচেষ্টা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়েছে। গত ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ তারিখে এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে কমিশন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্তদের জন্য কমিশনের দরজা চিরতরে বন্ধ।
প্রেক্ষাপট: অতীতের ছায়া ও বর্তমানের চ্যালেঞ্জ
২০১৬ সালের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় (১ম এসএলএসটি এবং ৩য় আরএলএসটি) পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। ওএমআর শিট কারচুপি থেকে শুরু করে অবৈধ উপায়ে চাকরি পাওয়ার সেই ঘটনাপ্রবাহ গড়িয়েছিল আদালত পর্যন্ত।
সেই সময় যারা অবৈধভাবে তালিকায় নাম তুলেছিলেন, তাদের অনেকেই ভেবেছিলেন ২০২৫ সালের নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়ায় (২য় এসএলএসটি/এনটিএস) ফের আবেদন করে পার পেয়ে যাবেন। কিন্তু কমিশনের প্রশাসনিক সদিচ্ছা এবং আধুনিক প্রযুক্তির মেলবন্ধনে সেই পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে।
প্রযুক্তিনির্ভর যাচাইকরণ:
‘সিস্টেম বেসড চেক’কমিশন এবার আবেদনপত্র যাচাইয়ের ক্ষেত্রে চিরাচরিত পদ্ধতির বাইরে গিয়ে অত্যন্ত আধুনিক ‘সিস্টেম বেসড চেক’ বা প্রযুক্তিনির্ভর যাচাইকরণ পদ্ধতি ব্যবহার করেছে।
২০১৬ সালের সেই বিতর্কিত নিয়োগের সম্পূর্ণ ডেটাবেস কমিশনের হাতে ছিল। ২০২৫ সালের নতুন আবেদনকারীদের তথ্যের সঙ্গে সেই পুরনো তথ্যের ‘ক্রস-ভেরিফিকেশন’ করা হয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডেটা অ্যানালিটিক্স ব্যবহার করে দেখা হয়, ২০১৬ সালের অযোগ্য তালিকায় থাকা কেউ পুনরায় আবেদন করেছেন কি না।
এই ডিজিটাল ফিল্টারিংয়ের মাধ্যমেই ধরা পড়ে যায় ৫৪৪ জন প্রার্থীর কারচুপি। দেখা যায়, নাম বা পরিচয় গোপন করার চেষ্টা করলেও ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট এবং পুরনো রোল নম্বর তাদের ধরিয়ে দিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গেই সিস্টেম থেকে তাদের আবেদনপত্র ‘রিজেক্ট’ বা বাতিল বলে ঘোষণা করা হয়।
বাতিলের খতিয়ান:
গ্রুপ সি ও গ্রুপ ডিকমিশনের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, অযোগ্য প্রার্থীরা মূলত গ্রুপ সি (ক্লার্ক) এবং গ্রুপ ডি (চতুর্থ শ্রেণীর কর্মী) পদের জন্যই বেশি আবেদন করেছিলেন। বাতিলের পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে:
পদের নাম বাতিল হওয়া প্রার্থীর সংখ্যা
গ্রুপ ডি (চতুর্থ শ্রেণীর কর্মী) ২৮৮ জন
গ্রুপ সি (ক্লার্ক) ২৫৬ জন
মোট বাতিল ৫৪৪ জন
বিজ্ঞপ্তিতে প্রার্থীদের অ্যাপ্লিকেশন আইডি, নাম এবং ২০১৬ সালের রোল নম্বর স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে দেওয়া হয়েছে। বাতিলের কারণ হিসেবে নির্দ্বিধায় জানানো হয়েছে: ‘Rejection being tainted candidate in respect of 3rd RLST 2016 (NT)’
অর্থাৎ, অযোগ্য প্রার্থী হিসেবে তাঁদের চিহ্নিত করা হয়েছে।
অ্যাডমিট কার্ড নিয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি
কমিশন তাদের বিজ্ঞপ্তিতে কোনো অস্পষ্টতা রাখেনি। স্পষ্ট জানানো হয়েছে, এই ৫৪৪ জন বাতিল হওয়া প্রার্থীর কাউকেই পরীক্ষার অ্যাডমিট কার্ড দেওয়া হবে না। প্রশাসনিক স্তরে কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যাতে যান্ত্রিক ত্রুটির সুযোগ নিয়েও কেউ পার না পায়। কমিশন আরও জানিয়েছে, যদি কোনোভাবে যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে কোনো বাতিল প্রার্থীর নামে অ্যাডমিট কার্ড ইস্যু হয়েও যায়, তবে সেটিকে অবৈধ বলে গণ্য করা হবে। পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রবেশের মুখেই তাদের আটকে দেওয়া হবে এবং আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
ভবিষ্যৎ সতর্কতা ও কমিশনের ক্ষমতা
কমিশনের এই লড়াই কেবল এই ৫৪৪ জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। নিয়োগ প্রক্রিয়ার পরবর্তী যে কোনও ধাপে—সেটি ইন্টারভিউ হোক বা কাউন্সেলিং—যদি দেখা যায় কোনও প্রার্থী ২০১৬ সালের দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বা কোনও তথ্য গোপন করেছেন, তবে কমিশন যে কোনও মুহূর্তে তাকে যোগ্য প্রার্থী হিসেবে খারিজ করার পূর্ণ অধিকার রাখে।
কমিশনের এই অবস্থান প্রমাণ করছে যে, ‘একবার অযোগ্য তো চিরকালই সে অযোগ্য’—এই নীতিতেই অনড় প্রশাসন।
শিক্ষামহলের প্রতিক্রিয়া
কমিশনের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে বাংলার যোগ্য চাকরিপ্রার্থী সমাজ ও শিক্ষাবিদরা। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে যারা সততার সঙ্গে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাদের জন্য এটি একটি বড় নৈতিক জয়।
এই কঠোর পদক্ষেপ ভবিষ্যতে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি করার মানসিকতাকে সমূলে উপড়ে ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে। যোগ্য প্রার্থীদের অনেকের মতেই, ‘প্রযুক্তির এই ব্যবহার এসএসসি-র হৃত গৌরব পুনরুদ্ধারে সাহায্য করবে।’
২০২৬ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারির এই বিজ্ঞপ্তিটি কেবল একটি প্রশাসনিক আদেশ নয়, এটি বাংলার শিক্ষা ব্যবস্থার শুদ্ধিকরণের একটি দলিল। ‘অযোগ্যদের’ চিহ্নিত করে ব্যবস্থার বাইরে রাখা এবং যোগ্যদের জন্য মাঠ প্রশস্ত করাই এখন কমিশনের প্রধান লক্ষ্য। কমিশনের এই কঠোর ও স্বচ্ছ ভূমিকা আগামী দিনে শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী নিয়োগে এক নতুন মাইলফলক হয়ে থাকবে।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, লাইফস্টাইল স্বাস্থ্য, প্রযুক্তির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের App, Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)
