জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: মহম্মদ শামির আইনি লড়াইয়ে নতুন মোড়- হাসিন জাহানের মামলা কলকাতা থেকে দিল্লিতে সরানোর আবেদন সুপ্রিম কোর্টে
ভারতীয় ক্রিকেট দলের অন্যতম বড় পেসার মহম্মদ শামি (Mohammed Sami) এবং তাঁর স্ত্রী হাসিন জাহানের (Hasin Jahan) দীর্ঘদিনের দাম্পত্য বিবাদ এবার দেশের সর্বোচ্চ আদালত অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্টের আঙিনায় পৌঁছেছে। সম্প্রতি হাসিন জাহান গার্হস্থ্য হিংসা (Domestic Violence Act) এবং খোরপোশ (Maintenance Case) সংক্রান্ত মামলাগুলো কলকাতা থেকে দিল্লির আদালতে স্থানান্তরের জন্য সুপ্রিম কোর্টে একটি আবেদন করেছেন। এই আবেদনের প্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্ট মহম্মদ শামিকে একটি নোটিশ জারি করেছে এবং তাঁর বক্তব্য জানতে চেয়েছে।
মামলার প্রেক্ষাপট: অভিযোগের পাহাড়
মহম্মদ শামি ও হাসিন জাহানের বিবাদ নতুন কিছু নয়। ২০১৮ সাল থেকেই তাঁদের সম্পর্কের অবনতি হতে শুরু করে। হাসিন জাহান অভিযোগ করেছিলেন যে, মহম্মদ শামী এবং তাঁর পরিবার তাঁকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করেছে। এর পাশাপাশি বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কের মতো গুরুতর অভিযোগও তুলেছিলেন তিনি। তৎকালীন সময়ে কলকাতা পুলিশ শামীর বিরুদ্ধে গার্হস্থ্য হিংসার ধারায় মামলাও রুজু করেছিল।
পরবর্তীতে হাসিন জাহান খোরপোশের দাবিতে কলকাতার আলিপুর আদালতে মামলা দায়ের করেন। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই আইনি লড়াই এখন এক নতুন বাঁকে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে হাসিন জাহান মনে করছেন কলকাতার চেয়ে দিল্লিতে মামলা চললে তাঁর জন্য সুবিধা হবে।
কেন মামলা স্থানান্তরের আবেদন?
হাসিন জাহান তাঁর আবেদনে বেশ কিছু কারণ দর্শিয়েছেন:
১. ব্যক্তিগত সুবিধা: বর্তমানে হাসিন জাহান দিল্লির কাছাকাছি কোথাও থাকছেন বা তাঁর কাজের সূত্রে দিল্লির আদালতে যাতায়াত করা সহজ হবে বলে দাবি করেছেন।
২. নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতা: অনেক সময় মামলাকারী পক্ষ মনে করেন যে স্থানীয় প্রভাবের কারণে বিচার প্রক্রিয়া প্রভাবিত হতে পারে। যদিও আদালতের রায়ে এমন কোনো সরাসরি ইঙ্গিত নেই, তবে স্থানান্তরের আবেদনে প্রায়ই নিরাপত্তার বিষয়টি উঠে আসে।
৩. শামির ব্যস্ততা: মহম্মদ শামি একজন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার। তাঁর বেশিরভাগ সময় জাতীয় বা আন্তর্জাতিক স্তরে খেলার জন্য বাইরে কাটবে অথবা দিল্লিতে বিসিসিআই-এর সদর দপ্তরের কাছে তাঁর যাতায়াত বেশি। এই যুক্তিতেও মামলা দিল্লিতে চালানোর সপক্ষে সওয়াল করা হতে পারে।
সুপ্রিম কোর্টের পদক্ষেপ: নোটিস জারি
সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হৃষিকেশ রায় এবং বিচারপতি প্রশান্ত কুমার মিশ্রের সমন্বয়ে গঠিত একটি বেঞ্চ হাসিন জাহানের এই পিটিশনটি শোনেন। প্রাথমিক শুনানির পর আদালত সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে শামীর বক্তব্য না শুনে কোনো নির্দেশ দেওয়া সম্ভব নয়। সেই কারণেই শামীকে এই মর্মে একটি নোটিশ পাঠানো হয়েছে যাতে তিনি ব্যাখ্যা করতে পারেন কেন এই মামলাগুলো কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তর করা উচিত নয়।
হাইকোর্ট ও নিম্ন আদালতের রায়
এর আগে কলকাতার নিম্ন আদালত শামীকে নির্দেশ দিয়েছিল হাসিন জাহানকে মাসে ৫০ হাজার টাকা করে খোরপোশ দিতে। তবে হাসিন জাহান এই অঙ্কে খুশি ছিলেন না। তিনি মাসিক ১০ লক্ষ টাকা খোরপোশের দাবি জানিয়েছিলেন। বিষয়টি কলকাতা হাইকোর্ট পর্যন্ত গড়ায়, কিন্তু সেখানেও চূড়ান্ত কোনো নিষ্পত্তি হয়নি। এই টানাপোড়েনের মাঝেই হাসিন জাহান দেশের সর্বোচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হলেন।
আইনি লড়াই বনাম ক্রিকেট ক্যারিয়ার
যখন এই আইনি বিতর্ক তুঙ্গে, তখন মহম্মদ শামি ভারতীয় দলের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত পারফর্ম করছেন। সাধারণত খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রে মাঠের বাইরের এই ধরণের মানসিক চাপ পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলে, তবে শামী নিজেকে মাঠের ভেতরে এবং বাইরে আলাদা রাখতে সক্ষম হয়েছেন। যদিও হাসিন জাহানের দাবি, শামী প্রভাব খাটিয়ে বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা করছেন।
পরবর্তী ধাপ কী হতে পারে?
সুপ্রিম কোর্টের নোটিশের জবাবে শামি এবং তাঁর আইনি দল তাঁদের হলফনামা জমা দেবেন। সেখানে তাঁরা হয়তো যুক্তি দেবেন কেন মামলাটি কলকাতাতেই থাকা উচিত। যদি সুপ্রিম কোর্ট মনে করে যে মামলা স্থানান্তরের পিছনে যথেষ্ট যুক্তি রয়েছে, তবে কলকাতার আলিপুর আদালতের ফাইলগুলো দিল্লির পাতিয়ালা হাউস বা অন্য কোনো উপযুক্ত আদালতে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।
মহম্মদ শামী ও হাসিন জাহানের এই মামলাটি ভারতের তারকাদের আইনি লড়াইগুলোর মধ্যে অন্যতম। খোরপোশ ও গার্হস্থ্য হিংসার মামলা সাধারণত দীর্ঘসময় ধরে চলে। হাসিন জাহানের এই নয়া চাল (মামলা দিল্লিতে সরানো) কেবল ভৌগোলিক সুবিধার জন্য নাকি এর পিছনে আরও কোনো কৌশল রয়েছে, তা নিয়ে জল্পনা চলছে। অন্যদিকে, শামীর জন্য এটি একটি বাড়তি আইনি ঝামেলা হয়ে দাঁড়াল, কারণ দিল্লিতে মামলা চললে তাঁকে বারবার সেখানে হাজিরা দিতে হতে পারে।
দেশের আইন ব্যবস্থার নিয়ম অনুযায়ী, ন্যায়বিচারের স্বার্থে যেকোনো পক্ষই মামলা স্থানান্তরের আবেদন করতে পারেন। সুপ্রিম কোর্ট এখন শামীর উত্তরের অপেক্ষায়। দুই পক্ষের লড়াই এখন কোন দিকে মোড় নেয়, তা নির্ধারিত হবে পরবর্তী শুনানির দিন।
