অর্ণবাংশু নিয়োগী: রাজ্যের শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। এবার দ্বিতীয় এসএলএসটি (SLST) পরীক্ষায় প্রশ্ন ভুল এবং সেই ভুল চ্যালেঞ্জ করার জন্য পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া সংক্রান্ত মামলায় কড়া অবস্থান নিল কলকাতা হাইকোর্ট।
ভুল প্রশ্ন পিছু ১০০ টাকা করে নেওয়ার আইনি বৈধতা ঠিক কতটুকু, সেই প্রশ্ন তুলে স্কুল সার্ভিস কমিশনকে (SSC) বিস্তারিত রিপোর্ট পেশ করার নির্দেশ দিয়েছেন বিচারপতি অমৃতা সিনহা।
মামলার প্রেক্ষাপট ও মূল অভিযোগ
সম্প্রতি নবম-দশম এবং একাদশ-দ্বাদশের শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষা (SLST) সম্পন্ন হয়েছে। গত ৭ই সেপ্টেম্বর নবম-দশম এবং ১৪ই সেপ্টেম্বর একাদশ-দ্বাদশের পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়। এর কিছুদিনের মধ্যেই কমিশন তাদের উত্তরপত্র বা ‘মডেল আনসার কী’ প্রকাশ করে। নিয়ম অনুযায়ী, কোনো পরীক্ষার্থীর যদি মনে হয় যে কমিশনের দেওয়া উত্তর ভুল, তবে তিনি সেটি চ্যালেঞ্জ করতে পারেন।
কিন্তু বিতর্কের সূত্রপাত হয় তখনই, যখন কমিশন প্রতিটি প্রশ্ন চ্যালেঞ্জ করার জন্য ১০০ টাকা করে ফি ধার্য করে। গত ২৫শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই চ্যালেঞ্জ জানানোর সুযোগ ছিল। মামলাকারীদের অভিযোগ, প্রায় ২৪টি প্রশ্ন ভুল রয়েছে এবং এই বিপুল সংখ্যক প্রশ্নের ভুল ধরিয়ে দিতে গিয়ে পরীক্ষার্থীদের পকেট থেকে বড় অঙ্কের টাকা খসেছে।
আদালতের কড়া প্রশ্ন ও নির্দেশ
সোমবার বিচারপতি অমৃতা সিনহার এজলাসে এই মামলার শুনানি ছিল। শুনানির সময় বিচারপতি কমিশনের এই অর্থ আদায়ের প্রক্রিয়া নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলেন। আদালত জানতে চায়:
১. প্রশ্ন চ্যালেঞ্জ করার নামে কমিশন মোট কত টাকা পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে তুলেছে?
২. মোট কতগুলি অভিযোগ বা চ্যালেঞ্জ জমা পড়েছে?
৩. শেষ পর্যন্ত কতগুলি প্রশ্ন ভুল বলে প্রমাণিত হয়েছে?
৪. নিয়ম অনুযায়ী, প্রশ্ন ভুল প্রমাণিত হলে সেই টাকা পরীক্ষার্থীদের ফেরত দেওয়ার কথা। বাস্তবে কতজনকে সেই টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে?
বিচারপতি স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন যে, আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে এই সমস্ত তথ্যের পরিসংখ্যানসহ একটি পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট হলফনামা আকারে আদালতে জমা দিতে হবে কমিশনকে।
আইনজীবীদের সওয়াল: আইন বনাম কমিশনের দাপট
মামলাকারীদের পক্ষে আইনজীবী ফিরদৌস শামীম সওয়ালে বলেন, ‘এসএসসির নিজস্ব আইনে প্রশ্ন চ্যালেঞ্জ করার জন্য বা উত্তরপত্র যাচাইয়ের জন্য পরীক্ষার্থীদের থেকে টাকা নেওয়ার কোনো স্পষ্ট বিধান নেই। টাকা নেওয়াটা সম্পূর্ণ আইনবহির্ভূত।’
অন্য এক আইনজীবী আশীষ কুমার চৌধুরী কমিশনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে জানান, কমিশন একটি নিজস্ব কমিটি গঠন করেছে যারা এই চ্যালেঞ্জগুলো খতিয়ে দেখে।
তাঁর অভিযোগ, ‘কমিশনের পছন্দের কমিটি যা বলছে সেটাই চূড়ান্ত বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে। এটি অত্যন্ত একতরফা প্রক্রিয়া। এমনকি পরীক্ষার্থীরা যখন প্রামাণ্য বা অথরাইজড বইয়ের তথ্য তুলে ধরছেন, কমিশন সেটিকেও গ্রাহ্য করছে না।’
পরীক্ষার্থীদের দুশ্চিন্তা ও ভবিষ্যৎ
হাজার হাজার পরীক্ষার্থী যারা দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগের আশায় বসে আছেন, তাঁদের কাছে এই ভুল প্রশ্নের বিড়ম্বনা এক নতুন উপদ্রব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অনেকের দাবি, প্রশ্ন ভুলের কারণে কয়েক নম্বরের জন্য তাঁরা মেধা তালিকা থেকে বাদ পড়তে পারেন। তার ওপর প্রশ্ন চ্যালেঞ্জ করতে গিয়ে টাকা খরচ হওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে শিক্ষিত বেকার যুবক-যুবতীদের মধ্যে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি এসএসসির আইনে টাকা নেওয়ার সংস্থান না থাকে এবং আদালত যদি এই প্রক্রিয়াকে অবৈধ ঘোষণা করে, তবে সংগৃহীত সমস্ত টাকা কমিশনকে ফেরত দিতে হতে পারে। এছাড়া প্রশ্ন ভুল প্রমাণিত হলে নতুন করে উত্তরপত্র মূল্যায়ন বা গ্রেস মার্কস দেওয়ার মতো পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে।
আগামী চার সপ্তাহ পর কমিশন যখন রিপোর্ট জমা দেবে, তখনই পরিষ্কার হবে ঠিক কত লক্ষ বা কোটি টাকা এই খাতে আদায় করা হয়েছে। কলকাতা হাইকোর্টের এই হস্তক্ষেপের ফলে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আসবে বলেই আশা করছেন চাকরিপ্রার্থীরা। চার সপ্তাহ পর রিপোর্টের ভিত্তিতেই আদালত ঠিক করবে এই মামলার পরবর্তী মোড় কোন দিকে ঘুরবে।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, লাইফস্টাইল স্বাস্থ্য, প্রযুক্তির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের App, Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)
