ধ্রুপদী সঙ্গীত থেকে পপ, সব গানেই সাবলীল, কিংবদন্তি আশা ভোঁসলের আট দশকের স্বর্ণালি সঙ্গীত সফর একনজরে | আশা ভোঁসলে: আট দশকের স্বর্ণালি সঙ্গীত সফর ও কিংবদন্তি গায়িকার জীবন কাহিনী | Asha Bhosle Life


News

-Ritesh Ghosh

কিংবদন্তি আশা ভোঁসলে ১৯৩৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর মহারাষ্ট্রের সাঙ্গলি জেলায় এক সঙ্গীত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা পণ্ডিত দীননাথ মঙ্গেশকর ছিলেন বিখ্যাত ধ্রুপদী সঙ্গীতশিল্পী ও অভিনেতা; মা শিবন্তী দেবী। মাত্র নয় বছর বয়সেই তিনি পিতাকে হারান।

পিতার প্রয়াণের পর পরিবার কোলাপুর হয়ে মুম্বই চলে আসে। কঠিন পরিস্থিতিতে আশা ও বড় দিদি লতা মঙ্গেশকর চলচ্চিত্রে গায়িকা ও অভিনেত্রী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৪৩ সালে মারাঠি ছবি ‘মাঝা বাল’-এর “চালা চালা নভ বালা” তাঁর প্রথম রেকর্ড করা গান।

১৯৪৮ সালে ‘চুনারিয়া’ ছবির “সাওয়ান আয়া” গানে তাঁর হিন্দি চলচ্চিত্রে আত্মপ্রকাশ। ‘আঁধো কি দুনিয়া’-এর গান আগে মুক্তি পেলেও, ১৯৪৯ সালে ‘রাত কি রানি’ ছবিতে তিনি প্রথম একক হিন্দি চলচ্চিত্র সঙ্গীত গেয়েছিলেন।

আশা ভোঁসলে ৫০, ৬০ ও ৭০-এর দশকের বলিউডের সঙ্গীত স্বর্ণযুগের অন্যতম আইকন। লতা মঙ্গেশকর, মহম্মদ রফি, কিশোর কুমার, মুকেশ, মান্না দে-এর পাশাপাশি তিনি এই যুগের প্রধান কণ্ঠস্বর। তাঁর শক্তিশালী ও বহুমুখী গায়কী তাঁকে বিশেষ পরিচিতি এনে দেয়।

চলচ্চিত্র, পপ, ধ্রুপদী, ভজন, গজল, লোকগীতি, কাওয়ালি ও রবীন্দ্রসঙ্গীত সহ অসংখ্য ধারায় তিনি দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। ২০টিরও বেশি ভারতীয় ও বিদেশী ভাষায় গান রেকর্ড করেছেন। ২০০৬ সালে জানান, কেরিয়ারে ১২,০০০-এরও বেশি গান গেয়েছেন, যা অবিশ্বাস্য মাইলফলক।

ভারতীয় সঙ্গীতে তাঁর অনবদ্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০০ সালে ভারতের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র সম্মান দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারে ভূষিত হন। ২০০৮ সালে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান ‘পদ্মবিভূষণ’ লাভ করেন তিনি।

অসংখ্য জনপ্রিয় পুরস্কারের পাশাপাশি আশা ভোঁসলে দুটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। ১৯৮১ সালে ‘উমরাও জান’ ছবির “দিল চিজ কিয়া হ্যায়” এবং ১৯৮৭ সালে ‘ইজাজত’ ছবির “মেরা কুছ সামান” গানের জন্য সম্মাননা পান। আট দশকেরও বেশি বিস্তৃত তাঁর বর্ণাঢ্য কর্মজীবন সঙ্গীতপ্রেমী ও শিল্পের কাছে অনুপ্রেরণা।

আশার সঙ্গীত জীবন ছিল বৈচিত্র্যময়, হৃদয়গ্রাহী গজল থেকে ক্যাবারে গান – সবেতেই তাঁর অবাধ বিচরণ ছিলো। ও.পি. নায়ারের সঙ্গে সৃষ্ট “আও হুজুর তুমকো” (কিসমত)-এর মতো জনপ্রিয় গান আজও স্মরণীয়। আর.ডি. বর্মনের “চুরা লিয়া হ্যায় তুমনে জো দিল কো” (ইয়াদোঁ কি বারাত) আজও রোমান্টিক সুরের প্রতীক।

“পিয়া তু অব তো আ যা” (কারবান) এবং “ইয়ে মেরা দিল” (ডন)-এর মতো গানে ভিন্ন সংবেদনশীলতা আনেন তিনি, যা হিন্দি সিনেমার সঙ্গীত ধারায় নতুন মাত্রা যোগ করে। ‘উমরাও জান’-এর “ইন আঁখো কি মাস্তি” এবং “দিল চিজ কিয়া হ্যায়”-এর মতো গানে তাঁর ধ্রুপদী সঙ্গীতে গভীর দখল স্পষ্ট ছিল।

১৯৯০-এর দশক ও ২০০০-এর দশকের প্রথম দিকেও আশা ভোঁসলে তাঁর সময়োপযোগী গায়কী ধরে রেখেছিলেন। আধুনিক পপ-সৃষ্ট ধারাতেও নিজেকে মানিয়ে নেন। এ.আর. রহমানের সঙ্গে তাঁর কাজ “তানহা তানহা” এবং “রঙ্গিলা রে” (‘রঙ্গিলা’ থেকে) ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।

‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে যায়েঙ্গে’ ছবির “জারা সা ঝুম লু ম্যাঁয়” ছিল চার্ট-ব্রেকার হিট। আদনান সামীর সাথে “কাভি তো নজর মিলাও”-এর মতো উল্লেখযোগ্য ইন্ডি-পপ ট্র্যাক প্রকাশ করেন, যা তরুণ প্রজন্মের কাছেও তাঁকে জনপ্রিয় করে তোলে।

১৯৯৭ সালে ব্রিটিশ অল্টারনেটিভ রক ব্যান্ড কর্নারশপ তাঁদের আন্তর্জাতিক হিট গান “ব্রিমফুল অফ আশা” তাঁকে উৎসর্গ করে। ১৯৯৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে গানটি ইউকে সিঙ্গলস চার্টে শীর্ষস্থান দখল করে। বহু শিল্পী রিমিক্সও করেছেন, যা তাঁর বৈশ্বিক প্রভাব প্রমাণ করে।

২০১৩ সালে আশা ভোঁসলে ‘মাই’ নামক চলচ্চিত্রে অভিনেত্রী হিসেবে মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় করে সবাইকে চমকে দেন। মহেশ কোদিয়াল পরিচালিত এই ছবিতে তাঁর সঙ্গে ছিলেন পদ্মিনী কোলাপুরি ও রাম কাপুর। আশাজির অভিনয় সমালোচকদের দ্বারা উচ্চ প্রশংসিত হয়, যা তাঁর বহুমুখী প্রতিভার আরেকটি দিক তুলে ধরে।

আশা ভোঁসলে সঙ্গীতের এমন এক অতুলনীয় যুগের প্রতিনিধিত্ব করেন, যেখানে সুর ও মৌলিকতার অনন্য মিশ্রণ ছিল, যা বলিউড আর কখনো সেভাবে অনুভব করেনি। তাঁর গান অগণিত ভক্তদের হৃদয়ে চিরকাল জীবন্ত থাকবে। কারণ, “দিল অভি ভরা নেহি”।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *