শেষ ট্রেনের যাত্রী
বেওয়ারিশ
কলকাতার রাত। শীতের হালকা কুয়াশা। শিরশিরে হাওয়ায় পোড়া ডিজেলের গন্ধ ক্রমে ভারী হয়ে নাক জ্বালা করছে। হাওড়া স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম তখন প্রায় ফাঁকা। শেষ বর্ধমান লোকাল সিটি দিল। যেন ফেরার খুব তাড়া।
অরিন্দম তাড়াহুড়ো করে দৌড়ে উঠল ট্রেনে। আজ শেষ পাতাটা প্রেসে দিতে বড্ড দেরি হয়ে গেছে। দেবীপুরের ভিটে ছেড়ে কলকাতায় সংবাদপত্রের দফতরে ১০ হাজারি চাকরিতে আরেকটা বাসা বাঁধতে মন চায়নি। তাই রোজের রেলজীবন। হাঁফাতে হাঁফাতেই কামরায় চোখ বুলিয়ে দেখে—পুরো ফাঁকা। শুধু এক কোণে বসে আছেন এক বৃদ্ধ, সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা।
অরিন্দম হালকা হাসি দিয়ে বলল,
—শেষ ট্রেন ধরতে পারলাম, নাহলে আজ হোটেলে রাত কাটাতে হতো।
বৃদ্ধ ধীরে মাথা তুললেন। গলায় অদ্ভুত কর্কশতা—
—শেষ ট্রেন… সবসময়ই গল্পে ভরা।
অরিন্দম অবাক হয়ে বলল,
—মানে?
বৃদ্ধ হেসে বললেন,
—এই ট্রেনে যারা ওঠে, সবাই গন্তব্যে পৌঁছায় না।
অরিন্দম হেসে উড়িয়ে দিল। কিন্তু তখনই ট্রেনের আলো এক মুহূর্তের জন্য নিভে গেল।
আলো ফিরতেই অরিন্দম দেখল—বৃদ্ধ নেই। অথচ দরজা বন্ধ।
হঠাৎ কানে এল ফিসফিস শব্দ—
তুমি কি জানো, এই কামরায় কতজনের মৃত্যু হয়েছে?
অরিন্দমের গা শিউরে উঠল। সে উঠে দাঁড়াল। কামরার জানলার বাইরে কুয়াশার ভেতর অদ্ভুত ছায়া নড়ছে।
হঠাৎ ট্রেন থেমে গেল। স্টেশন নেই, আলো নেই—শুধু অন্ধকার মাঠ।
দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছেন সেই বৃদ্ধ। কিন্তু এবার তাঁর মুখে নেই কোনো চশমা—চোখ দুটো ফাঁকা গর্ত।
তিনি ধীরে ধীরে বললেন,
—তুমি তো গল্প লেখো, তাই না? এবার তোমার গল্পের শেষ লাইন লিখে দাও।
অরিন্দম চিৎকার করে উঠল।
পরের দিন সকালে হাওড়া স্টেশনের এক কোণে পাওয়া গেল অরিন্দমের ব্যাগ। ভেতরে শুধু একটা নোটবুক—শেষ পাতায় লেখা:
শেষ ট্রেনের যাত্রী… আমি।
