মানস বিশ্বাস: সালটা সম্ভবতঃ ২০০১ অথবা ০২। ততদিনে পাক্ষিক আনন্দলোক থেকে সাপ্তাহিক পত্রিকা বিভাগে উঠেছি। উঠেছি— কারণ সেই মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডের পর ৬ নম্বর প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিটের পেল্লায় সাদা বাড়ির অন্দরমহলে কিছু পরিবর্তন হয়েছে। যদিও আগের মতোই দেশ, আনন্দমেলা, সানন্দা আর আনন্দলোকের দফতর তিনতলাতেই রইল। আর ক্রীড়া সাংবাদিক গৌতম ভট্টাচার্যের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাপ্তাহিক ‘পত্রিকা’ (ফিচার) ছিল চারতলায়। আগেও অবশ্য তাই-ই ছিল। আমি ছিলাম তিনতলায় ‘আনন্দলোক’ বিভাগে।
যাই হোক— সে তো উপরেরতলায় উঠলাম। কিন্তু পরীক্ষা কঠিন। যোগ্যতা কম। তার ওপর সবচেয়ে ছোট কর্মী। সব অর্থেই। হঠাৎই একদিন প্রিন্সিপাল করেসপন্ডেন্ট পদমর্যাদার গৌতম চক্রবর্তীর নির্দেশ— “এবার মহালয়ার (আকাশবাণীর মহিষাসুরমর্দিনী) ৭০ বছর। যা লোকজনের সঙ্গে কথা বলে একটা ভালো লেখা নিয়ে আয়”।
লাও তো বটে কিন্তু আনি কীভাবে! বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র সশরীরে নেই। পঙ্কজকুমার মল্লিক, বাণীকুমারেরও সশরীরে থাকার প্রশ্নই নেই। আছেন বলতে সেই প্লে ব্যাকের প্রখ্যাত কুশীলবরা। কিন্তু তাঁদের হদিশ মিলবে কোথায়! ছোট্ট ক্লু দিল গৌতমদা (চক্রবর্তী)। ওটাই ট্রেনিংয়ের ‘ট’। ২ নম্বর চৌরঙ্গী স্কোয়ারের এইচএমভি-র সিটি অফিস। ৬ নম্বর প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিটের ঢিলছোঁড়া দূরে। লাফাতে লাফাতে ৫ মিনিটের রাস্তা পেরিয়ে কাঁচের দরজা ঠেলে ছিমছাম আলোর সেই অফিসে ঢুকে পড়লাম। গোটা অফিসে জনাদশেক কর্মীও নেই। আওয়াজ তো নেই-ই। বাঁদিকের টেবিলে একমনে জাবদা খাতা খুলে কীসব লিখছেন এক ভদ্রলোক। মাঝেমাঝে পিছনের আলমারি থেকে ফাইলপত্র বের করে দেখছেন… আবার সেই জাবদা খাতায় কীসব লিখছেন। কয়েকঝলক দেখলাম। আমাকে দেখলেন না। শেষে মৃদুস্বরে কোথা থেকে কেন এসেছি, সংক্ষেপে বলতেই মুখ তুলে তাকালেন। তারপর ততোধিক নীচু গলায় সামনের দেওয়াল ঘেঁষা সিঁড়ির দিকে দেখিয়ে ম্যাজেনাইন ফ্লোরের একটা ছোট ঘরের দিকে ইশারা করে যেতে বললেন। পরবর্তীকালে লোকটার সঙ্গে আলাপ জমে গিয়েছিল। এই দু’ যুগ পরে নাম মনে নেই। তবে পদবী মনে আছে— বন্দ্যোপাধ্যায়। আর সেদিন সেই ঘরে যাঁর শরণাপন্ন হয়েছিলাম, তিনি এইচএমভি-র তৎকালীন পূর্বাঞ্চলীয় কর্তা জ্যোতিশঙ্কর গুপ্ত।
ঘরে ঢুকতেই ডানদিকের দুটো চেয়ারে দেখি ‘ভূমি’-র সৌমিত্র আর সুরজিৎ বসে। সেবার সম্ভবতঃ ওঁদেরও একটা পুজোর অ্যালবাম বেরিয়েছিল এইচএমভি থেকে। ততদিনে অবশ্য ‘RPG এইচএমভি’ হয়ে গেছে।
ঘরে ঢুকে মিনিটদশেক পর কথা বলার সুযোগ পেলাম। শুনে ফের পাঠিয়ে দিলেন নীচের সেই ব্যানার্জিবাবুর কাছে। এলাম। ফের উদ্দেশ্য বললাম। এবার তিনি একে একে পঙ্কজকুমার মল্লিক, বাণীকুমার, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের পরবর্তী প্রজন্মের দু’একজনের নাম্বার দিলেন। আর দিলেন সেই ‘আলোর বেনু’-র সন্ধান। সুপ্রীতি ঘোষের টেলিফোন নম্বর। লাফাতে লাফাতে অফিসে ঢুকেই ফোন। সময় পেলাম। এবং সেই অনুযায়ী পরদিন নিঝুম দুপুরে (যতদূর মনে পড়ে) দক্ষিণপশ্চিম কলকাতার এক বনেদি মহল্লার সাবেকি বাড়িতে পৌঁছে গেলাম। বাড়ির লোকজন বোধহয় দিবানিদ্রায় ছিল। বর্ষীয়ান ক্ষীণ অনুচ্চ কিংবদন্তি শিল্পীর সঙ্গে একটা নিভু আলোর ঘরে বসে শুরু হল ইন্টারভিউ।
ইন্টারভিউ আবার কী! একতরফা যেন ইতিহাসের মুগ্ধ করে দেওয়া ক্লাস। যা শুনলাম, তা হুবহু এইরকম—
তখন প্রতিবছর মহালয়ার ভোরের অন্ততঃ ঘন্টা দুয়েক আগেই মহিলা আর পুরুষ শিল্পীদের আলাদা গাড়িতে বাড়ি বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে আসা হত। স্নান করে লালপেড়ে শাড়ি আর ধুতিপাঞ্জাবি ছিল বাধ্যতামূলক। বিরাট স্টুডিও ধুপধুনো ফুলের গন্ধে ম ম করত। এক স্বর্গীয় পরিবেশ। গোটা মহিষাসুরমর্দিনী গীতিআলেখ্যটাই লাইভ সম্প্রচার হত।
তা সেবছর কেন কে জানে, পঙ্কজকুমার সকলকে উদ্দেশ্য করে বললেন, বয়স হয়েছে। কবে কী হয় জানি না। তোমরা সকলে কিন্তু মনপ্রাণ উজার করে দিও। ওই এককথায় যেন অন্য একটা অনুভূতি সকলের মধ্যে এসে গিয়েছিল। তন্ময় হয়ে যে যার ভূমিকা পালন করেছিলেন। অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর সকলেই বেশ খানিকক্ষণ নিস্তব্ধ স্টুডিওয় বুঁদ হয়ে বসেছিলেন। এরপর সকলের নজর পড়েছিল পঙ্কজকুমারের দিকে। মাথা নীচু করে বসে আছেন। আধবোজা চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ছে জল। ব্যাপার কী! কোনও ভাবাবেশ! রহস্যের পর্দা সরিয়ে পঙ্কজকুমার মল্লিক জানালেন, লাইভ সম্প্রচারের সময়ে, সকলের অলক্ষ্যে অজান্তে কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গোটা অনুষ্ঠানের রেকর্ডিং নিঃশব্দে সুসম্পন্ন হয়ে গেছে। ১৯৬৬ সালের সেই রাতশেষের ভোরে। আর কোনওদিন এই পূণ্যক্ষণে তাঁদের কারওকে এই অনুষ্ঠান করতে আসতে হবে না। বরং বাড়িতে বসেই নিজেরা নিজেদের নিবেদন শুনতে পাবেন।
কাকতালীয় কিনা জানি না— সুপ্রীতি ঘোষের কথায়— এর কিছুদিনের মধ্যেই নাকি পঙ্কজকুমার পরলোকগমন করেন।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, লাইফস্টাইল স্বাস্থ্য, প্রযুক্তির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের App, Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)
