জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: শুরু হয়ে গিয়েছে ৩১ – তম কলকাতা আর্ন্তজাতিক চলচ্চিত্র উত্সব ২০২৫। প্রতি বছরের মতন এ বছর ও, শিশির মঞ্চে আয়োজিত হয়েছিল সত্যজিত্ রায়ের স্মরণে এক লেকচার যার মুখ্য বক্তা ছিলেন বলিউডের কিংবদন্তি পরিচালক রমেশ সিপ্পি।

বক্তৃতার শুরুতেই সিপ্পি জানালেন, ‘সিনেমা কী তা আমি নিজেও বুঝিনি। সিনেমা প্রতিদিন শিখতে হয়।’ তিনি বলেন, প্রযুক্তির বদল হলেও সিনেমার আত্মা একই থাকে। ৭০ mm, ৩৫ mm এগুলো কেবল মাধ্যম। আসল কথা হলো, ভালো গল্প আর সৎ প্রচেষ্টা।
নিজের শৈশবের কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, ‘আমি প্রথম সাত বছর বয়সে আমার বাবা জি.পি. সিপ্পির সেটে গিয়েছিলাম। সেখান থেকেই সিনেমার প্রেমে পড়েছিলাম।’
আরও পড়ুন: শুরু হল কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উত্সব! উদ্বোধনের মঞ্চেই বড় ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রীর…
শুক্রবারের বক্তৃতায় সিপ্পি সম্পূর্ণ মনোনিবেশ করেন তাঁর কালজয়ী সৃষ্টি শোলে-র নির্মাণ প্রক্রিয়ায়— যে ছবিটি এ বছর ৫০ বছর পূর্ণ করছে। ‘শোলে’-র স্মৃতিচারণে তিনি বলেন যে ছবিটির সূচনা হয়েছিল চার লাইনের একটি আইডিয়া থেকে। সেলিম–জাভেদের লেখা স্ক্রিপ্ট, গব্বর সিংয়ের চরিত্র, ধর্মেন্দ্র–সঞ্জীব কুমারের রোল বাছাই সবই ছিল এক অনন্য অভিজ্ঞতা।
তিনি জানান, ‘ছবির অনুপ্রেরণা এসেছিল একাধিক হলিউড চলচ্চিত্র থেকে। ‘ম্যাকেন্নাস গোল্ড’, ‘বুচ ক্যাসিডি অ্যান্ড দ্য সানড্যান্স কিড’, এবং ‘দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট সেভেন’। যদিও আকিরা কুরোসাওয়ার ‘সেভেন সামুরাই’ থেকে অনুপ্রাণিত তবে আমি অনেক পরে দেখিছি,’ বলে জানান সিপ্পি।
গব্বর সিংয়ের চরিত্র প্রসঙ্গে সিপ্পির মন্তব্য, ‘গব্বর ছিল এক ইম্পালসিভ মানুষ। এক মুহূর্তে হাসছে, পরের মুহূর্তেই রেগে যাচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘জাভেদ আখতার এমনভাবে দৃশ্য লিখেছিলেন যে, আমি বুঝেছিলাম, ও ঠিক সেটাই ধরেছে যা আমি চেয়েছিলাম।’
ধর্মেন্দ্রর কাস্টিং নিয়ে সিপ্পি জানান, অভিনেতা প্রথমে সন্দিহান ছিলেন কোন চরিত্রে অভিনয় করবেন। ‘ঠাকুর সাহেবের রোলটা করি? গল্প তো ওনার,’ বলেছিলেন ধর্মেন্দ্র। এমনকি গব্বরের চরিত্রও তাঁকে আকর্ষণ করেছিল। আমি বলেছিলাম, ‘তুমি ভিলেন করবে কীভাবে!’ শেষে হালকা ঠাট্টার ছলে বলেছিলাম, ‘বীরুই তো হেমাকে পাবে! এই কথাতেই রাজি হয়েছিলেন।”
হেমা মালিনীর কথায় তিনি জানান, ‘ওর সাহস ও প্রতিশ্রুতি অসাধারণ ছিল। সীতা অউর গীতা করতে গিয়েও প্রথমে দ্বিধায় ছিল, কিন্তু আমার বিশ্বাসই ওকে সাহস জুগিয়েছিল। শোলে-তে বাসন্তী চরিত্রে ও একেবারে দুর্দান্ত।’
সম্প্রতি প্রয়াত অভিনেতা আসরানির কথাও উল্লেখ করে তিনি জানান, ‘সীতা অউর গীতা ছবিতেও ছোট রোলে ছিল, কিন্তু শোলে-তে জেলারের চরিত্রে ও ছিল দুর্দান্ত। একইভাবে শচিন পিলগাঁওকরও সংক্ষিপ্ত কিন্তু স্মরণীয় চরিত্রে ছিলেন।’
আরও পড়ুন: বলিউডে নক্ষত্রপতন! সঞ্জীব কাপুরকে ভালোবেসেছিলেন, অধরা প্রেমে থেকেই বিদায় উত্তমের নায়িকার….
ছবির প্রথম দৃশ্য ছিল জয় (অমিতাভ বচ্চন) রাধাকে চাবি ফেরানোর মুহূর্ত, আর প্রথম বড় সিকোয়েন্স ছিল ঠাকুরের পরিবারের হত্যাকাণ্ড। তবে সবচেয়ে কঠিন ছিল বিখ্যাত ‘লণ্ঠন দৃশ্য’, যেখানে জয়া বচ্চন আলো জ্বালাচ্ছেন, আর নিচে অমিতাভ mouth organ বাজাচ্ছেন। ‘প্রতিদিন সেই আলো পাওয়া যেত মাত্র একবার। বিকেল ৫.৪৫-এ শুট হতো। এক মিনিট এদিক-ওদিক হলেই প্রভাব নষ্ট হয়ে যেত। তাই ১৫–২০ দিন লেগেছিল ওই দৃশ্য শেষ করতে,’ স্মৃতিচারণ করেন তিনি। অন্যদিকে, বাসন্তীর নাচের দৃশ্যটি শ্যুট করতে লেগেছিল মাত্র চার দিন। তিনি আরও বলেন, ‘এখন প্রযুক্তিতে অনেক কিছু পোস্ট-প্রোডাকশনে করা যায়, কিন্তু তখন সবই হাতে করতে হত।’
শোলের সিক্যুয়েল তৈরি করার প্রসঙ্গে তিনি বলেন শোলে আজও প্রাসঙ্গিক, তাই শোলে নিয়ে আর কাজ না করে, নতুন কিছু বানানো ভালো।
তিনি আরও জানান, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-কে তিনি প্রস্তাব দিয়েছেন এক যৌথ প্রজেক্টের, যেখানে থাকবে কলকাতা ও মুম্বই। ‘সঠিক বিষয় পেলেই আমি খুশি মনে সেই কাজ করব,’ বলেন সিপ্পি।
বক্তৃতার শেষে ৭৮ বছরের এই কিংবদন্তি তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতাদের উদ্দেশে বলেন, ‘সিনেমা ভালো হলে দর্শক আসবেই। সিনেমা কখনও মরে না। ভালো, বিনোদনমূলক ও শক্তিশালী সিনেমা বানাও। যেখানে থাকবে শিল্প এবং বাণিজ্যের সঠিক মেলবন্ধন।’
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, লাইফস্টাইল স্বাস্থ্য, প্রযুক্তির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের App, Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)
