জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: বলিউডের গ্ল্যামার আর ইঁদুর দৌড়ের বাজারে যেখানে টিকে থাকাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, সেখানে এক অনন্য নজির গড়লেন অভিনেতা পঙ্কজ ত্রিপাঠী। দীর্ঘদিনের ব্যস্ততা, একের পর এক প্রজেক্ট এবং জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকা সত্ত্বেও তিনি ঘোষণা করেছেন অভিনয় থেকে সাময়িক বিরতির কথা। কোনো শারীরিক অসুস্থতা নয়, বরং কাজের একঘেয়েমি (Monotony) এবং সৃজনশীল ক্লান্তি থেকেই নিজেকে লাইমলাইট থেকে দূরে সরিয়ে নেওয়ার এই সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।
ব্যস্ততা ও সৃজনশীলতার সংঘাত
পঙ্কজ ত্রিপাঠী মানেই পর্দায় এক সহজাত ও শান্ত উপস্থিতি। ‘মির্জাপুর’-এর কালীন ভাই হোক বা ‘নিউটন’-এর দায়িত্ববান অফিসার—প্রতিটি চরিত্রেই তিনি নিজেকে উজার করে দিয়েছেন। কিন্তু সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি স্বীকার করেছেন যে, গত কয়েক বছরে বিশেষ করে করোনার পরবর্তী সময়ে তিনি এতটাই যান্ত্রিকভাবে কাজ করছিলেন যে, অভিনয়ের প্রতি তার সেই আদি টান কমতে শুরু করেছিল।
পঙ্কজ বলেন, ‘আমি টানা কাজ করছিলাম। একটা সময় মনে হচ্ছিল আর কোনও নতুনত্ব নেই। ক্লান্তি ধরে গিয়েছিল। কাজটা আর উপভোগ করতে পারছিলাম না। তাই বিরতি নেওয়া খুব জরুরি ছিল।” একজন প্রকৃত শিল্পীর কাছে অভিনয়ের রসদ আসে জীবন ও চারপাশ থেকে। কিন্তু শুটিংয়ের ব্যস্ত রুটিন তাকে জীবনকে উপভোগ করার এবং নতুন কিছু শেখার সুযোগ দিচ্ছিল না।
ইএমআই (EMI)-এর দোহাই নয়, প্রাধান্য শিল্পীসত্তার
বলিউডে অনেক অভিনেতা কেবল আর্থিক সুরক্ষা বা ইএমআই (EMI) মেটানোর তাগিদে বছরের পর বছর কাজ করে যান। কিন্তু পঙ্কজ এই ধারার বাইরে হাঁটতে চান। তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, তিনি এমন কোনো প্রজেক্ট করতে চান না যা শুধু তার আর্থিক দায় মেটাবে।
তার কথায়, ‘এখন আমি এমন জায়গায় আছি যেখানে শুধু শিল্পীসত্তার সন্তুষ্টিই আমার প্রথম পছন্দ। কাজ মানে উত্তেজনা, নতুন কিছু শেখার সুযোগ। না হলে সেই কাজ আমি করব না।’ এই মন্তব্যটি বর্তমান বিনোদন জগতের জন্য একটি বড় বার্তা, যেখানে গুণের চেয়ে সংখ্যার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
কেন এই বিরতি? পঙ্কজের বয়ানে ‘মানসিক পুনর্গঠন’
একটি সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে পঙ্কজ জানিয়েছেন, তিনি নিজে অন্যদের ‘ভেবেচিন্তে জীবন কাটানোর’ কথা বলতেন, অথচ নিজেই দ্রুতগতির জীবনে জড়িয়ে পড়েছিলেন। অভিনেতারা যে ‘অস্ত্র’ বা অভিনয় দক্ষতা ব্যবহার করেন, সেটিকে কোথায় এবং কী ভাবে ব্যবহার করা উচিত, তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে বলে তিনি মনে করেন।
বিগত বছরগুলোতে তার কাজের চাপ ছিল পাহাড়প্রমাণ। গত বছর মুক্তি পেয়েছে তার অভিনীত সিনেমা ‘মেট্রো ইন দিনো’ এবং জনপ্রিয় ওয়েব সিরিজ ‘ক্রিমিনাল জাস্টিস: এ ফ্যামিলি ম্যাটার’। পঙ্কজ স্বীকার করেছেন যে, টানা ৩০ দিন শুটিং করার ফলে যে মানসিক ও শারীরিক ক্লান্তি আসে, তা সহ্য করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। এই অবসাদ কাটাতেই তিনি নিজের জীবনে ‘পজ বাটন’ টিপেছেন।
মির্জাপুর এবং ইন্ডাস্ট্রির ওপর প্রভাব
পঙ্কজ ত্রিপাঠীর এই বিরতির ঘোষণায় স্বাভাবিকভাবেই চিন্তিত তার অগণিত ভক্ত এবং নির্মাতারা। বিশেষ করে ‘মির্জাপুর’-এর কালীন ভাইয়ের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় জল্পনা তুঙ্গে। তবে অভিনেতা আশ্বস্ত করেছেন যে, যেসব প্রজেক্টে তিনি ইতিমধ্যে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, সেগুলো তিনি সময়মতো শেষ করবেন। তবে নতুন কোনো চিত্রনাট্যে তিনি এখনই সই করছেন না।
বলিউড বিশ্লেষকদের মতে, পঙ্কজের মতো একজন শক্তিশালী অভিনেতার অনুপস্থিতি ইন্ডাস্ট্রিতে বড় প্রভাব ফেলবে। কারণ বর্তমান সময়ের অনেক বড় বাজেটের কাজ কেবল তাকে মাথায় রেখেই লেখা হয়। তার এই সাময়িক প্রস্থান অন্য শিল্পীদেরও অনুপ্রাণিত করতে পারে যে, মাঝে মাঝে থামা এবং নিজেকে সময় দেওয়া জীবনের এক অপরিহার্য অংশ।
প্রত্যাবর্তনের নীল নকশা
পঙ্কজ ত্রিপাঠী স্পষ্ট করেছেন যে, এই বিরতি মানেই অবসর নয়। বরং এটি একটি প্রস্তুতি। তিনি চান তার প্রতিটি কাজ যেন দর্শকদের মনে গভীর দাগ কাটে। তিনি বলেন, “যখনই আমি মনে করব আমার ভেতরে অভিনয়ের ক্ষুধা পুনরায় জন্মেছে এবং আমি নতুন কিছু দিতে পারব, তখনই আমি দ্বিগুণ উৎসাহ নিয়ে ক্যামেরার সামনে দাঁড়াব।”
আপাতত এই সময়টা তিনি তার পরিবারের সাথে কাটাবেন, দেশ-বিদেশে ভ্রমণ করবেন এবং নিজেকে পুনরায় আবিষ্কার করার চেষ্টা করবেন। যান্ত্রিকতা ঝেড়ে ফেলে একজন ‘মানুষ’ হিসেবে জীবনকে দেখা এবং সেখান থেকে অভিনয়ের নতুন রসদ জোগাড় করাই হবে তার এই বিরতির মূল লক্ষ্য।
পঙ্কজ ত্রিপাঠীর এই সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে, তিনি কেবল একজন বড় অভিনেতা নন, বরং একজন সৎ শিল্পী। ইঁদুর দৌড়ের নেশায় মত্ত না হয়ে নিজের সৃজনশীলতাকে গুরুত্ব দেওয়ার এই সাহস সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে।
বলিউডের জৌলুসপূর্ণ পৃথিবীতে এই বিরতি সম্ভবত পঙ্কজ ত্রিপাঠীকে আরও একধাপ পরিণত অভিনেতা হিসেবে ফিরিয়ে আনবে, যার প্রতীক্ষায় থাকবে আপামর দর্শক।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, লাইফস্টাইল স্বাস্থ্য, প্রযুক্তির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের App, Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)
