প্রবীর চক্রবর্তী: বঙ্গ রাজনীতিতে বাম শিবিরের অন্দরে অস্বস্তি এখন চরমে। ডায়মন্ড হারবারের পরিচিত তরুণ মুখ প্রতিকুর রহমান-এর দলত্যাগ এবং তাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিতর্ক এখন আর সিপিএমের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সপ্তাহের শুরুতে শুরু হওয়া এই টানাপড়েন বর্তমানে রাজ্য রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
শোনা যাচ্ছে আগামিকাল শনিবার ২১ফেব্রুয়ারি ভাষা দিবসের শুভ মুহূর্তে সিপিআইএমের দলত্যাগী নেতা প্রতীক উর আমতলায় একটি রাজনৈতিক কর্মসূচীতে তৃণমূলে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগদান করছেন। আর সেখান থেকেই শুরু হবে তাঁর রাজনৈতিক যাত্রার দ্বিতীয় অধ্যায়। আর তার আগে, মহম্মদ সেলিমের সাংবাদিক বৈঠকে কান্নার কথা শুনে প্রতীক উরেক কথায় শ্লেষ ঝরে পড়ে। তিনি স্পষ্টতই জানান যে, সেলিমের এই কান্না আসলে ‘মরা কুমিরের কান্না’। তিনি আরও বলেন যে, দীর্ঘ ৪ মাস ধরে তিনি অসংখ্যবার চোখের জল ফেলেছেন। ৪ মাস ধরে তাঁকে বারবার ফিরিয়ে দিয়েছেন সেলিম। আর এবার তিনি ময়দানে নামবেন এবং দেখে নেবেন তাঁদের।
ঘটনার সূত্রপাত ও চিঠির রহস্য
ঘটনার সূত্রপাত হয় যখন প্রতিকুর রহমান দলের শীর্ষ নেতৃত্বের কর্মপদ্ধতি ও সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে একটি চিঠি পাঠান। সেই চিঠিতে তিনি সিপিএমের প্রাথমিক সদস্যপদ ত্যাগের পাশাপাশি জেলা ও রাজ্য কমিটির সমস্ত দায়িত্ব থেকে অব্যাহতির আবেদন জানান। কিন্তু বিড়ম্বনার বিষয় হলো, এই অত্যন্ত গোপনীয় চিঠিটি দলের অন্দর থেকে বাইরে বেরিয়ে আসে এবং তা প্রকাশ্যে আনেন তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক কুণাল ঘোষ।
ক্ষুব্ধ প্রতিকুর ও গোপনীয়তা ভঙ্গের অভিযোগ
নিজের ব্যক্তিগত ইস্তফাপত্র তৃণমূল নেতার হাতে পৌঁছানোয় কার্যত ফেটে পড়েছেন প্রতিকুর। তাঁর প্রশ্ন, দলের অভ্যন্তরীণ সাংগঠনিক চিঠি কীভাবে বাইরের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কাছে পৌঁছাল? তিনি সরাসরি অভিযোগ তুলেছেন যে, দলের অন্দরেই কোনো পক্ষ এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে লিপ্ত। এই বিষয়ে তিনি নেতৃত্বের কাছে জবাবদিহিও চেয়েছেন। প্রতিকুরের ঘনিষ্ঠ মহলের দাবি, তাঁর লড়াই সুনির্দিষ্ট কিছু নেতৃত্বের বিরুদ্ধে, আদর্শের বিরুদ্ধে নয়।
তীর মহম্মদ সেলিমের দিকে
প্রতীক উর জানান যে, তাঁর রাজনৈতিক আত্মহত্যার জন্য আলিমুদ্দিনের বাবুরা দায়ী। তাঁর পোস্টমর্টেম করলে দেখা যাবে, কেন এই প্রতীক উরের মতো হাজার হাজার ছেলের রোজ রাজনৈতিক হত্যা হয়। মহম্মদ সেলিম শুধু শতরূপ বোঝে, আর হুমায়ুন বোঝে। প্রতীক উরের সঙ্গে কথা বলার সময় তাঁর নেই। আসলে তাঁর বক্তব্য- সেলিমের ‘পুত্রহারা’ বক্তব্য শুধুই লোক দেখানো, এতদিন পর তাঁর টনক নড়েছে। প্রতীক উরের সাফ কথা, ‘মহম্মদ সেলিম হুমায়ুন কবীরের মতো নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করার সময় পান, অথচ নিজের দলের নেতাদের ফোন করার বা কথা বলার সময় তাঁর হয় না।’ তাঁর মতে, এই আচরণ অত্যন্ত ‘ঔদ্ধত্যপূর্ণ’। লোকসভা ভোটে ডায়মন্ড হারবার কেন্দ্রে বাম প্রার্থীর অভিযোগ, যখন কোনও কাজের কৃতিত্ব নেওয়ার সময় আসে, তখন সেলিম সামনে থাকেন। কিন্তু দল যখন বিপদে পড়ে বা কোনো জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তখন তিনি দায় এড়িয়ে বলেন— “সবই দল জানে।” নেতার এই দ্বিচারিতা নিচুতলার কর্মীদের মনোবল ভেঙে দিচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।
সম্মেলন থেকে বাদ ও দলবদলের জল্পনা
এই বিতর্কের আঁচ এতটাই যে, সদ্য সমাপ্ত সিপিএমের রাজ্য সম্মেলনে প্রতিকুর রহমানকে আর আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। দলের এই কড়া অবস্থানের পর তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে জল্পনা আরও তীব্র হয়েছে। রাজনৈতিক মহলের একাংশের ধারণা, প্রতিকুর এবার তৃণমূলে যোগ দিতে পারেন। যদিও এ নিয়ে এখনও কোনো চূড়ান্ত ঘোষণা হয়নি।
নজর এখন আলিমুদ্দিনে
তরুণ ও লড়াকু এই মুখকে হারানো এবং দলের গোপন নথি ফাঁসের ঘটনা সিপিএমের অনুশাসন ও অভ্যন্তরীণ সংহতি নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। আলিমুদ্দিনের শীর্ষ নেতৃত্ব এই ড্যামেজ কন্ট্রোল কীভাবে করে এবং প্রতিকুর শেষ পর্যন্ত কোন রাজনৈতিক পথ বেছে নেন, এখন সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে রাজ্যের রাজনৈতিক মহল।
