West Bengal
-Ritesh Ghosh
তৃণমূল কংগ্রেসের লড়াই এবার দল ছাড়িয়ে ব্যাঙ্ক পর্যন্ত পৌঁছে গেল। বিধাননগর দক্ষিণ থানায় দলীয় বিধায়কদের একাংশের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে তৃণমূলের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ বা লেনদেন স্থগিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাজ্য পুলিশের সাইবার সেলের চিঠি পাওয়ার পর ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ এই পদক্ষেপ করেছে।
সূত্রের খবর, এই তিনটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট মিলিয়ে রয়েছে প্রায় ৪৪০ কোটি টাকা। আপাতত ওই অ্যাকাউন্টগুলি থেকে কোনও প্রকার আর্থিক লেনদেন করা যাবে না। বিধানসভা নির্বাচনে বিপর্যয়ের পর এমনিতেই রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা ঘাসফুল শিবির। এই পরিস্থিতিতে বিপুল অঙ্কের অর্থের ওপর আইনি নিষেধাজ্ঞা দলের দৈনন্দিন পরিচালনা ও সাংগঠনিক কাজে বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলের মতে, এই নজিরবিহীন আর্থিক সংকটের সূত্রপাত দিন দুই আগে তৃণমূলের প্রাক্তন কোষাধ্যক্ষ অরূপ বিশ্বাসের একটি চিঠিকে কেন্দ্র করে। তিনি দলের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার দাবি জানিয়ে চিঠি লিখেছিলেন। সেই সিদ্ধান্তের পিছনে জোরালো সওয়াল করেন নতুন তৃণমূলের মুখ ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। সন্দেহ প্রকাশ করে তিনি জানিয়েছিলেন, এই অ্যাকাউন্টগুলিতে অন্য কোনো বেআইনি টাকা জমা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার।
ঘটনার মোড় ঘোরে আজ শুক্রবার, যখন ঋতব্রতর কাছের দশ জন তৃণমূল বিধায়ক বিধাননগর দক্ষিণ থানায় গিয়ে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টগুলি অবিলম্বে ফ্রিজ করার আবেদন জানান। বিধায়কদের এই অভিযোগ পত্রের গুরুত্ব বিবেচনা করে তৎপর হয় পুলিশ প্রশাসন। সাইবার সেল দ্রুত তদন্তের স্বার্থে ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেয়, এবং সেই অনুযায়ী ৩টি অ্যাকাউন্ট সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট সাময়িকভাবে বন্ধ হওয়ায় দলের অভ্যন্তরে বড়সড় সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। তবে এই পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে নেতৃত্ব ইতিমধ্যেই বিকল্প উপায়ের কথা ভাবছে। দল সূত্রের খবর, আপৎকালীন পরিস্থিতিতে সাংসদ ও বিধায়করা নিজেদের তহবিল থেকে আপাতত দলের ছোটখাটো খরচ সামলাবেন।
আইনি ও প্রশাসনিকভাবে এই সিদ্ধান্তকে হালকাভাবে নিচ্ছে না কালীঘাটের তৃণমূল নেতৃত্ব। দলের রাজ্য মুখপাত্র তথা বেলেঘাটার বিধায়ক কুণাল ঘোষ গোটা বিষয়টি স্বীকার করে নিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, “খবরটি সত্য এবং দলের নেতৃত্ব অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে গোটা পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে।” কালীঘাট তৃণমূলের শীর্ষ মহলের দাবি, এই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে খুব শীঘ্রই আদালতের দ্বারস্থ হওয়া হবে।
তৃণমূল শিবিরের একাংশের দাবি, দলের অন্দরে ক্ষমতার রাশ নিজের হাতে রাখার লক্ষ্যেই নতুন কোষাধ্যক্ষ নিয়োগ করা হয়েছিল। গত ৫ জুন দলের বিশ্বস্ত নেতা শুভাশিস চক্রবর্তীকে কোষাধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ করা হয় এবং সেই সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় সমস্ত নথিপত্র ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছিল। তৃণমূলের অফিশিয়াল নেতৃত্বের বিশ্বাস, নতুন কোষাধ্যক্ষ নিয়োগের ফলে প্রাক্তন কোষাধ্যক্ষ অরূপ বিশ্বাসের আগের আবেদনের কোনো আইনি ক্ষমতা থাকে না।
এদিকে বিদ্রোহী বা ‘আসল তৃণমূল’ শিবিরের অন্যতম বিশিষ্ট মুখ তথা দলীয় বিধায়ক সন্দীপন সাহা আদালতের বাইরেও রাজনৈতিক চাপ বজায় রাখতে সচেষ্ট হয়েছেন। তিনি সাফ জানিয়েছেন, দলের এই বিপুল পরিমাণ টাকার আইনি উৎস কী, তা পুলিশি তদন্তে প্রমাণিত হওয়া দরকার।
সন্দীপনের কথায়, “বর্তমান যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে ওই ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টগুলিতে লেনদেন অবিলম্বে বন্ধ থাকা উচিত ছিল। পুলিশ অভিযোগ পেয়ে সঠিক পথেই পদক্ষেপ করেছে। আমরা চাই এই ৪৪০ কোটি টাকার প্রকৃত উৎস ও এর বৈধতা নিয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হোক।”
