পুলিশের টহলদার গাড়ি সেই সময়ে বর্ধমানের মিঠাপুকুরে ঢুকেছে। স্ত্রীর ফোন রাখতেই ওই সাব-ইনস্পেক্টর দেখতে পান, একদল যুবক কার্তিক ঠাকুরের মূর্তি কোলে নিয়ে একটি বাড়ির পাঁচিল টপকানোর চেষ্টা করছেন। এমনিতেই কার্তিকপুজো করতে হবে ভেবে মেজাজ সপ্তমে চড়েছিল ওই এসআইয়ের। তার উপর চোখের সামনে অমনটা দেখে তিনি গাড়ি থেকে জলদি নেমে পড়েন। এসআই ওই যুবকদের চেপে ধরতেই তাঁরা মতলবের কথা খুলে বলেন। ‘ইয়ার্কি পেয়েছিস, লোককে অপদস্থ করা, চল সবাই থানায়’ বলে ধমক দিয়ে ওই সাত-আট জন যুবককে সোজা বর্ধমান থানায় ঢুকিয়ে দেন কার্তিক-যন্ত্রণায় অস্থির সেই পুলিশ অফিসার। রাতে অবশ্য থানার ওসি সব শুনে আগে একচোট হাসেন। তার পর তিনি জানান, এক্ষেত্রে মামলা রুজু করলে গুরুদণ্ড হয়ে যাবে। তার চেয়ে বরং, কার্তিক ঠাকুর ফেলার চেষ্টার অভিযোগে রাতভর ওই যুবকদের থানায় বসিয়ে রাখা হোক। সকাল হলে থানা থেকে তাঁদের ছেড়ে দিলেই হবে। কার্তিক ঠাকুর ফেলতে যাওয়া ওই দলে থাকা গুডশেড রোডের অভিষেক সাহা বলছেন, “পুলিশ আমাদের ধরেছিল ঠিকই, তবে খারাপ ব্যবহার করেনি। সারা রাত বসিয়ে রেখে সকালে ছেড়ে দিয়েছে।”
কার্তিক ঠাকুর কেউ বাড়ির দরজায় ফেলছে কি না, তা নিয়ে ভয়ে থাকেন বিশেষ করে নব দম্পতিরা। কারণ, নব দম্পতির সন্তান কামনায় বাড়িতে কার্তিক ঠাকুর ফেলা প্রাচীন প্রথা। কেউ একবার কার্তিক ফেলে গেলে শাস্ত্রীয় বিধান অনুযায়ী, পর পর তিন বছর পুজোর নিদান রয়েছে! এবং বাড়িতে যারা কার্তিক ঠাকুর রেখে গিয়েছে, তেতো মুখে হলেও তাদের ডেকে ভোজ খাওয়াতে হয়।রাধানগর পাড়ার মুকুল সাহা বলছেন, “এই প্রথার জন্য অনেককে বিড়ম্বনায় ফেলা হচ্ছে। আমাদের পাড়াতেই পঞ্চাশোর্ধ্ব এক দম্পতির বাড়িতে কার্তিক ঠাকুর ফেলে দিয়ে গিয়েছে। কোনও মানে হয়!” নীলপুরের সমরজিৎ বিশ্বাসের কথায়, “সবে তিন মাস হলো, আমার ছেলের বিয়ে হয়েছে। বুধবার সকালে দরজা খুলে দেখি, বাড়িতে তিনটে কার্তিক ফেলা হয়েছে। এটা অত্যাচার নয়?”
বীরহাটা কালীবাড়ির প্রধান পুরোহিত দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের অবশ্য বক্তব্য, ‘এখন মজাটাই বেশি হয়।’ পূর্ব বর্ধমান জেলার পুলিশ সুপার কামনাশিস সেন বলছেন, “গভীর রাতে একদল ছেলে পাঁচিল টপকাতে গেলে পুলিশ তো ধরবেই। পরে জানা যায়, তারা এক বন্ধুর বাড়িতে কার্তিক ঠাকুর রাখতে যাচ্ছিল, কোনও অপরাধমূলক কাজে জড়িত ছিল না। গভীর রাত বলে তখন থানায় বসিয়ে রেখে সকালেই তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।” কিন্তু একে রাতভর থানায় থাকা, তার উপর শেষমেশ কার্তিক ফেলতে পারলেন না বলে ওই যুবকদের ভোজ খাওয়ার পরিকল্পনা মাটি!
