Alipurduar News : ক্যারাটে-প্যাঁচে পাচার রোধের পাঠ – shukla debnath fighting against problem of trafficking of women and children alipurduar


পিনাকী চক্রবর্তী, আলিপুরদুয়ার
দু’টি পাতা একটি কুঁড়ির সংসারে ভরা সবুজের নীচে জমাট বাঁধা আঁধার রাত। খেলতে খেলতে হঠাৎ উধাও আঙিনার ফুলগুলো। ফিসফিস কথা ওড়ে…। এ বাড়ির কিশোরীর মুখ আর দেখা যায় না। ও বাড়ির তরুণীই বা গেল কই? কখনও অজান্তে, কখনও জেনে, কখনও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের হাতছানিতে আড়কাঠিদের বিশ্বাস করে মুখগুলো হারিয়ে যায় কোন অজানায়। চা-মহল্লা থেকে মুছে যায় নাম।

Buxa Forest : বক্সার জঙ্গলে সক্রিয় পাখি পাচার চক্র, অবশেষে গ্রেফতার মূল পাণ্ডা
মহল্লার অন্যতম সমস্যা নারী ও শিশু পাচার। যা নিয়ে প্রশাসনের দুশ্চিন্তার শেষ নেই। সেই সমস্যার বিরুদ্ধে লড়াই চালাচ্ছেন আলিপুরদুয়ারের (Alipurduar) নতুন হাসিমারার শুক্লা দেবনাথ। একক চেষ্টায় এ পর্যন্ত বহু পাচার রুখতেও পেরেছেন। তাঁর প্রশংসা করে জেলার পুলিশ সুপার ওয়াই কে রঘুবংশী বলেন, “উনি সমাজের জন্য দারুণ কাজ করে চলেছেন।” ৩৭ বছরের শুক্লা পাচার বন্ধে ‘সাঁড়াশি’ পন্থা অবলম্বন করেছেন। একদিকে, আত্মরক্ষার কৌশল হিসেবে এলাকার মেয়েদের শেখাচ্ছেন ক্যারাটে। অন্যদিকে, তাদের স্বনির্ভর করতে বিউটিশিয়ান কোর্স করাচ্ছেন।

আলিপুরদুয়ারের (Alipurduar) কালচিনি চা-বলয়ের চা-বাগানগুলোতে একটা দৃশ্য আজকাল মাঝেমধ্যেই চোখে পড়ে। চা-গাছের ফাঁকে ফাঁকে বসানো কিছু চেয়ার। তাতে বসে আদিবাসী নারীরা। ক’জন তরুণী ব্যস্ত এঁদের রূপচর্চায়। সেই বাগানেরই অন্য প্রান্তে তখন হয়তো ক্যারাটে প্র্যাক্টিস করছে কচিকাঁচারা। আর এই দু’য়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখেন শুক্লা। ২০০৩ সালে মাধ্যমিক পাশ করার পর স্কুলে যাওয়ার সাইকেলটা মাত্র ৭০০ টাকায় বিক্রি করে বিউটিশিয়ান কোর্স ও ক্যারাটে শিখেছিলেন শুক্লা। সেই শিক্ষাই এখন ছড়িয়ে দিচ্ছেন চা-মহল্লায়। উদ্দেশ্য স্পষ্ট – রুখতে হবে নারী ও শিশু পাচার, পড়াতে হবে স্বনির্ভরতার পাঠ, জানাতে হবে আত্মরক্ষার কৌশল।

Cash Recovered : ফের বিপুল পরিমাণ টাকা উদ্ধার, কালিয়াচকে মাদক কারবারীর বাড়িতে মিলল ৩৩ লাখ
প্রথম দিকে শুক্লার কাজকর্ম ঠাট্টার ছলে উড়িয়ে দিতেন সবাই। জুটত ব্যঙ্গবিদ্রুপও। অথচ টানা কুড়ি বছর অনেকটা ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর ঢঙে কাজ চালিয়ে গিয়েছেন তিনি। পরিবারে পাঁচ বোনের চতুর্থ শুক্লা। বাকিরা বিয়ে-থা করে সংসারী হলেও সে পথে হাঁটা হয়নি তাঁর। তিনি অবিচল নিজের লক্ষ্যে। চা-বলয়ের বহু নারী ও শিশুর পাচার আটকেছেন প্রায় একক চেষ্টায়। তারই মধ্যে সাহিত্যে স্নাতকোত্তর করেছেন দূরশিক্ষায়। করেছেন BEd-ও।

আসলে স্কুলে পড়তে পড়তেই অনেক সহপাঠীকে হারিয়ে যেতে দেখেছিলেন। জেদের শুরু সেই থেকে। শুক্লার কথায়, “চা-বলয়ে বড় হয়ে ওঠার কারণে অগুনতি নারী ও শিশুকে পাচার হতে দেখেছি। তখনই মনে একটা জেদ চেপে বসে। তাই ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। প্রথম দিকে পরিবারেরও সায় ছিল না। কিন্তু আজ ভাবতে ভালো লাগে যে কিছুটা হলেও ওদের পাশে দাঁড়াতে পেরেছি। এটাই আমার জীবনের পরম প্রাপ্তি।”

Cattle Smuggling Case : গোরু নিয়ে কাঁটাতার পেরনোর চেষ্টা, BSF-এর গুলিতে আহত পাচারকারী
নারী পাচার রুখতে গিয়ে বারচারেক নিজেও পড়েছেন পাচারকারীদের খপ্পরে। বেঁচেছেন পুলিশের সহায়তায়। তবু নিরক্ষর আদিবাসী ও নেপালি অভিভাবকদের বোঝানোর কাজ চালিয়ে গিয়েছেন শুক্লা। সাদ্রি আর গোর্খালি ভাষায় দখল রয়েছে তাঁর। তাই যে কোনও ঝুপড়ি ঘরে ঢুকে হাঁড়ির খবর নিতে সময় লাগে না। তা ছাড়া বিশ্বস্ত অনুগামীদের মোবাইলে টাকা ভরে দিয়ে গড়েছেন এক দুর্দান্ত নেটওয়ার্ক। যার ফলে পাচারের খবর পাওয়া সহজতর হয়েছে।

চা-বাগানে থেকেও যে বিকল্প রোজগার সম্ভব, ক্রমাগত কাউন্সেলিংয়ে চা-বাগানের মেয়েদের সেটাও বোঝাতে পেরেছেন। এখন তাঁর নেটওয়ার্ক এমনই যে কালচিনি চা বলয়ের যে কোনও বাগান থেকে কেউ পাচারের মতলব আঁটলেই খবর পৌঁছে যায় শুক্লার কাছে। প্রথমে নিজে বুঝিয়ে রোখার চেষ্টা করেন। নেহাত অপারগ হলে পুলিশ-প্রশাসনের সাহায্য নেন।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *