
রহস্যের জগতে এমন এক নাম আছে, যাকে ঘিরে মানুষের কৌতূহল আজও ফুরোয়নি—সে হলো শার্লক হোমস । একটা ভাঙা দেশলাই কাঠি, মাটিতে পড়ে থাকা অস্পষ্ট পায়ের ছাপ কিংবা বাতাসে ভেসে থাকা ধোঁয়ার গন্ধ—এসব সামান্য সূত্র থেকেই সে বুঝে ফেলতে পারত অপরাধীর পরিচয়। তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ আর অসাধারণ যুক্তিবোধই ছিল তার সবচেয়ে বড় শক্তি। তাই গোয়েন্দা চরিত্রের কথা উঠলেই সবার আগে মনে পড়ে শার্লক হোমসের নাম।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ ও বিংশ শতাব্দীর শুরুর লন্ডনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই কাল্পনিক গোয়েন্দা চরিত্র সৃষ্টি করেছিলেন আর্থার কনান ডয়েল। তাঁর কলমের জাদুতেই জন্ম নিয়েছিল রহস্য–রোমাঞ্চে ভরা অসংখ্য গল্প। এতটাই জীবন্তভাবে তিনি হোমসকে ফুটিয়ে তুলেছিলেন যে অনেকেই বিশ্বাস করতে পারতেন না—শার্লক হোমস বাস্তবে নেই। লন্ডনের বিখ্যাত ২২১বি বেকার স্ট্রিটে ছিল এই গোয়েন্দার বাস, আর বর্তমানে সেই ঠিকানায় গড়ে উঠেছে একটি জাদুঘর, যা আজও ভক্তদের আকর্ষণের কেন্দ্র।
শার্লক হোমসের সবচেয়ে জনপ্রিয় কাহিনিগুলোর একটি হলো The Hound of the Baskervilles। রহস্য, ভয় আর অতিপ্রাকৃত আবহে ঘেরা এই উপন্যাসে বাস্কারভিল পরিবারের ওপর নেমে আসে এক অভিশাপের ছায়া। বিশাল এক ভয়ংকর শিকারি কুকুর নাকি রাতের অন্ধকারে ঘুরে বেড়ায় জলাভূমিতে এবং পরিবারটির সদস্যদের মৃত্যুর কারণ হয়ে ওঠে। স্যার চার্লস বাস্কারভিলের রহস্যময় মৃত্যুর পর তাঁর বন্ধু ডা. মরটিমার সাহায্যের জন্য শরণাপন্ন হন শার্লক হোমস ও ডক্টর ওয়াটসনের। শেষ পর্যন্ত হোমস যুক্তি ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রমাণ করে, এর পেছনে কোনো অলৌকিক শক্তি নয়, বরং একজন মানুষের ষড়যন্ত্র কাজ করছিল।
তবে এই বিখ্যাত উপন্যাসকে ঘিরেও তৈরি হয়েছে আরেক রহস্য। প্রায় একশ বছর পর, ২০০০ সালে মনস্তত্ত্ববিদ ও লেখক Roger Garrick-Steele দাবি করেন, দ্য হাউন্ড অব দ্য বাস্কারভিলসের প্রকৃত ধারণা এসেছিল ডয়েলের বন্ধু Bertram Fletcher Robinson – এর কাছ থেকে। তাঁর অভিযোগ ছিল, ডয়েল নাকি গল্পটির মূল ভাবনা রবিনসনের কাছ থেকে নিয়ে নিজের নামে প্রকাশ করেছিলেন। আরও ভয়ংকর অভিযোগ ওঠে—এই সত্য গোপন রাখতেই রবিনসনকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়েছিল।
চিঠিপত্র, উইল, মৃত্যুসনদসহ নানা তথ্য–প্রমাণের ভিত্তিতে এই বিস্ফোরক তত্ত্ব সামনে আনেন রজার গ্যারিক। এমনকি তিনি বিষয়টি Scotland Yard –এর কাছেও তুলে ধরেন। যদিও এত আলোড়ন সৃষ্টির পরও গত কয়েক দশকে এই অভিযোগের কোনো নিশ্চিত সমাধান পাওয়া যায়নি। ফলে রহস্য থেকেই গেছে—শার্লক হোমসের স্রষ্টাকে ঘিরে এই অদ্ভুত কাহিনির সত্য আসলে কী?
রহস্যভেদে শার্লক হোমস যেমন ছিলেন অতুলনীয়, তেমনি তাঁকে ঘিরেও যেন তৈরি হয়েছে আরেক রহস্যের গোলকধাঁধা। আর সেই রহস্যের জাল উন্মোচনের চেষ্টা করেছিলেন গবেষক Roger Garrick-Steele। তাঁর এই ‘গোয়েন্দাগিরি’ শুরু হয় ১৯৮৯ সালে, যখন তিনি ইংল্যান্ডের ডেভনের ছোট্ট গ্রাম ইপলপেনের পার্ক হিল হাউসে বসবাস শুরু করেন। জায়গাটি ছিল The Hound of the Baskervilles –এর পটভূমি ডার্টমুরের খুব কাছেই। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে জন্ম নেয় এক চাঞ্চল্যকর তত্ত্ব।
গ্যারিকের দাবি, তদন্তের সূত্রপাত হয়েছিল এক অদ্ভুত ঘটনা থেকে। তিনি তাঁর বসার ঘরের দেয়ালে Arthur Conan Doyle–এর শৈশবের একটি ছবি টাঙিয়েছিলেন। কিন্তু ছবিটি বারবার দেয়াল থেকে পড়ে যাচ্ছিল। এই ঘটনাকে তিনি যেন রহস্যের ইঙ্গিত হিসেবেই নিয়েছিলেন। এরপর শুরু হয় দীর্ঘ অনুসন্ধান। নানা তথ্য ও দলিল ঘেঁটে তিনি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে দ্য হাউন্ড অব দ্য বাস্কারভিলস–এর মূল ধারণা এসেছে Bertram Fletcher Robinson–এর লেখা ১৯০০ সালের বই An Adventure on Dartmoor থেকে। গ্যারিকের মতে, দুটি কাহিনির মিল এতটাই স্পষ্ট যে তা নিছক কাকতালীয় হতে পারে না।
রবিনসন ছিলেন দক্ষিণ ডেভনের মানুষ। ছোটবেলা থেকেই ডার্টমুর অঞ্চলের নানা কিংবদন্তি, রহস্য আর লোককথা শুনে বড় হয়েছেন তিনি। কোনান ডয়েলের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্বও ছিল বেশ ঘনিষ্ঠ। ১৯০১ সালে এক গলফ ভ্রমণে দুজন একসঙ্গে কয়েক দিন কাটান। সেই সময় রবিনসন ডয়েলকে ডার্টমুরের রহস্যময় পরিবেশ, গুহা, পাহাড়ি পথ আর জলাভূমির নানা গল্প শোনান। বিশাল এক ভয়ংকর কুকুরের কিংবদন্তিও তখনই উঠে আসে আলোচনায়। এই রহস্যময় আবহে মুগ্ধ হয়ে ডয়েল নাকি ভাবতে শুরু করেন—যদি শার্লক হোমসকে এই পরিবেশে পাঠানো যায়, তাহলে কেমন গল্প তৈরি হতে পারে!
গ্যারিকের দাবি অনুযায়ী, রবিনসন পরে An Adventure on Dartmoor নামে একটি পাণ্ডুলিপিও লিখেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে যখন উপন্যাসটি The Strand Magazine–এ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়, সেখানে লেখক হিসেবে শুধু কোনান ডয়েলের নামই ছাপা হয়। আর এখান থেকেই জন্ম নেয় বিতর্ক।
তবে অভিযোগ এখানেই থেমে থাকেনি। গ্যারিক আরও দাবি করেন, গল্পের প্রকৃত উৎস ফাঁস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই কোনান ডয়েল রবিনসনকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। তাঁর মতে, এই কাজে সহযোগিতা করেছিলেন রবিনসনের স্ত্রী গ্ল্যাডিস। গ্যারিকের অভিযোগ অনুযায়ী, ধীরে ধীরে বিষ প্রয়োগ করে রবিনসনকে হত্যা করা হয়। যদিও সরকারি নথিতে ১৯০৭ সালের ২১ জানুয়ারি তাঁর মৃত্যুর কারণ হিসেবে টাইফয়েডের কথা উল্লেখ করা হয়।
গ্যারিক এসব দাবির পক্ষে নানা অদ্ভুত তথ্যও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, মৃত্যুর ঠিক আগে তোলা এক ছবিতে রবিনসনকে সুস্থ-স্বাভাবিক দেখাচ্ছিল, অথচ দাবি করা হয়েছিল তিনি তখন মৃত্যুশয্যায়। এমনকি রবিনসনের গাড়িচালকও বহু বছর পরে এক সাক্ষাৎকারে জানান, তিনি গাড়িতে বসে দুই বন্ধুকে An Adventure on Dartmoor নামের একটি পাণ্ডুলিপি নিয়ে আলোচনা করতে শুনেছিলেন। এসব তথ্য মিলিয়ে গ্যারিকের বিশ্বাস ছিল—রবিনসনের মৃত্যু মোটেও স্বাভাবিক ছিল না।
তবে এই তত্ত্ব মানতে নারাজ Sherlock Holmes Society। সংগঠনটির মুখপাত্র হিথার ওয়েনের মতে, রবিনসন অবশ্যই গল্পের পটভূমি ও কিছু ধারণা দিয়েছিলেন, কিন্তু পুরো উপন্যাসের স্রষ্টা ছিলেন কোনান ডয়েলই। ডয়েল নিজেও সম্পাদককে লিখেছিলেন যে গল্পটির মূল লেখনশৈলী তাঁর হলেও স্থানীয় কিংবদন্তি ও পরিবেশের ধারণা রবিনসনের কাছ থেকে এসেছে। এমনকি বই প্রকাশের পর রয়্যালটির একটি অংশও রবিনসন পেতেন।
হিথার ওয়েন আরও বলেন, রবিনসনের স্ত্রী গ্ল্যাডিসের সঙ্গে ডয়েলের প্রেমের অভিযোগও ভিত্তিহীন। কারণ, সেই সময় ডয়েল তাঁর ভবিষ্যৎ দ্বিতীয় স্ত্রী জিন লেকির প্রেমে মগ্ন ছিলেন। তাই রবিনসনকে হত্যার কোনো যৌক্তিক কারণ ছিল না বলেই তাঁদের দাবি।
শেষ পর্যন্ত সত্যটা আজও অজানা। গ্যারিকের অভিযোগের পক্ষে চূড়ান্ত কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। হয়তো এই রহস্যের সমাধান কোনো দিনই হবে না। আর এ কারণেই যেন নতুন করে মনে পড়ে শার্লক হোমসের সেই বিখ্যাত উক্তি—
“অসম্ভবকে বাদ দেওয়ার পর যা অবশিষ্ট থাকে, তা যতই অবিশ্বাস্য মনে হোক না কেন, সেটাই সত্য।”