
শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন হিঙ্গলগঞ্জের নুরুল ইসলামের মতো আরও অনেকের চোখেও। যাঁরা কেবল টেটে বসবেন বলে সুন্দরবনের দু’টি নদী পেরিয়ে ভোর না হতেই রওনা দিয়েছেন পরীক্ষা কেন্দ্রের উদ্দেশে। নুরুলের সিট পড়েছিল দমদমের মতিঝিল কলেজে। পরীক্ষা দিয়ে বেরিয়ে মধ্যত্রিশের নুরুল বলেন, ‘কেবল মাস্টার হব বলে মাছ ধরে সংসার চালিয়েছি এতকাল। তবু পড়াশোনাটা ছাড়িনি। অনেক কষ্ট করেছি। এ বার যদি একটা হিল্লে হয়!’ বজবজের সুজাতা মেটের মেয়ে স্বর্ণালি রাত জেগে টেটের জন্য পড়াশোনা করেছেন এই ক’দিন। আগে দু’বার ২০১৪ ও ২০১৭ সালে টেট দিয়েছিলেন তিনি। দু’বারই সফল হতে পারেননি। সুজাতার কথায়, ‘নিয়োগ দুর্নীতির খবরে মেয়েটা হতাশায় চলে গিয়েছিল। ৩৮ বছর বয়স হলো। সরকারি চাকরির জন্য আর তো বেশি সময়ও নেই। তাই হয়তো শেষবার একটা চেষ্টা করছে।’
কিন্তু চাকরি নিয়ে যখন এত অভিযোগ, গ্রেপ্তারি, সেই আবহে কি সত্যিই চাকরি পাওয়ার ব্যাপারে তাঁরা আশাবাদী? টেট পরীক্ষার্থী অনসূয়া মণ্ডলের জবাব, ‘আশাবাদী হব না কেন? আগেও তো নিয়োগ হয়েছে। সব তো পিছনের দরজা দিয়ে হয়নি! আমার মনে হয়, এ বার আরও স্বচ্ছ নিয়োগ হবে। কারণ এত নিরাপত্তা, এত প্রতিশ্রুতি, এত আয়োজন – এমনটা তো আগে হয়নি।’ এই প্রার্থীরা যখন একটা চাকরির আশায় সাত নদী পেরোচ্ছেন, তখন পথের ধারে ধুলোর উপরে সেই চাকরির দাবিতেই বসে আছেন আগের প্রাথমিক থেকে এসএসসি টেটে সফল ছেলেমেয়েরা। রবিবার এসএসসি-র আন্দোলন ৬৩৭-তম দিন পেরিয়েছে। ধর্নামঞ্চ থেকেই আন্দোলনের অন্যতম মুখ শহীদুল্লাহ বলেন, ‘আমাদের অনেকে প্রাথমিকের এই টেটের ফর্ম পূরণ করেও পরীক্ষা দিতে গেলাম না। কারণ পরীক্ষা আর ইন্টারভিউ দিতে দিতে আমরা ক্লান্ত। আমরা চাই, নিয়োগটা এই ধর্নামঞ্চের দাবি মেনেই হোক।’ আবার, নিজেদের তিক্ত অভিজ্ঞতা বিচার করে এ দিনের টেটের আয়োজন দেখে সন্তুষ্ট ১১৬ দিন ধরে ধর্নায় থাকা ২০১৪-র টেটে সফল চাকরিপ্রার্থীরা। তাঁদের তরফে অচিন্ত্য সামন্ত বলেন, ‘আমাদের সময়ে পরীক্ষার দিন কোনও নিয়ম মানা হয়নি। খাতা হারিয়েছে, খাতা বদল করে দেওয়া হয়েছে। এ বারের মতো আয়োজন তখনও থাকলে হয়তো আমাদের আন্দোলনে নামতে হতো না।’
তবে এতকিছুর পরেও বহু প্রার্থীরই প্রশ্ন – নিয়োগটা স্বচ্ছ ভাবে হবে তো? শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু বলেন, ‘স্বচ্ছতার সঙ্গে পরীক্ষা নিতে, কাউন্সেলিং করাতে এবং স্বচ্ছ ভাবে নিয়োগপত্র হাতে তুলে দিতে পারেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই। সেটা আজ টেটের অভাবনীয় আয়োজন দেখলেই বোঝা যায়।’