অনির্বাণ ঘোষ
কোভিড থেকে সেরে উঠেও কেন প্রাণ যায় মিউকরমাইকোসিসে? কেন হয় এই ছত্রাক সংক্রমণ? দুনিয়াকে এ বার তারই খোঁজ দিলেন একদল বাঙালি চিকিৎসক-গবেষক। গবেষণাপত্রের আকারে সেই মূল্যবান কাজের কথা বৃহস্পতিবার ফলাও করে ছাপা হয়েছে বিখ্যাত বিজ্ঞানপত্রিকা ‘আমেরিকান সোসাইটি ফর মাইক্রোবায়োলজি জার্নাল’-এ।

করোনাকালের এক বিষাক্ত ছোবল ছিল মিউকরমাইকোসিস। কোভিড থেকে সেরে ওঠার পর এই ছত্রাক ঘটিত সংক্রমণ হামলা চালিয়েছিল কলকাতার অন্তত ১৫০ জনের শরীরে। যে সব করোনা-আক্রান্ত মানুষ ডায়াবিটিসের শিকার, দীর্ঘদিন যাঁরা স্টেরয়েড থেরাপিতে ছিলেন এবং যাঁদের অক্সিজেন থেরাপি চলাকালীন সেই ব্যবস্থার মধ্যে পরিচ্ছন্নতাজনিত সমস্যা ছিল, সাধারণত তাঁদেরই হচ্ছিল এই অসুখটা। এই সংক্রমণে মৃত্যুহার প্রায় ৩০ শতাংশ বলে বিষয়টা চিন্তায় রেখেছিল চিকিৎসকদেরও। এর চিকিৎসাও মহার্ঘ।

Covid 19 Today: নয়া ভ্যারিয়্যান্টের দাপটে সংক্রমণ বাড়ল ৯ শতাংশ, অ্যাক্টিভ রোগী ৫০ হাজার ছুঁইছুঁই
কিন্তু একটা বিষয়ে কিছুতেই সন্তোষজনক উত্তর পাচ্ছিলেন না চিকিৎসকরা। আর সেটা হলো, বহু করোনা-আক্রান্ত মানুষই স্টেরয়েড থেরাপি পান, তাঁদের অনেকে ডায়াবিটিসেরও শিকার, ফাঙ্গাসযুক্ত অক্সিজেনও পেয়েছেন তাঁদের মধ্যে বহু রোগী। তার পরেও সকলের হয় না কেন মিউকরমাইকোসিস? কেবল হাতেগোনা কয়েক জনেরই কেন হয় এই সংক্রমণ?

এ বার সেই উত্তরটাই মিলল ওই বাঙালি চিকিৎসক-গবেষকদের দৌলতে। মূলত কলকাতায় হওয়া সেই গবেষণা দেখিয়ে দিলো, নাটের গুরু হলো মোনোসাইট কিংবা ম্যাক্রোফাজে়র মতো এক শ্রেণির শ্বেত রক্তকণিকা এবং সেগুলোর কিছু ঘাটতিই আদতে প্রাণঘাতী এই সংক্রমণ ডেকে আনে।

প্রকল্পের মুখ্য গবেষক, যাদবপুরের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ কেমিক্যাল বায়োলজি (আইআইসিবি)-র ট্রান্সলেশনাল রিসার্চ ইউনিট অফ এক্সেলেন্সের ইমিউনোলজি বিশেষজ্ঞ দীপ্যমান গঙ্গোপাধ্যায় জানাচ্ছেন, ছত্রাক সংক্রমণের বিরুদ্ধে ইমিউন সিস্টেম প্রথমে যে ভাবে প্রতিরোধ তৈরি করে, তা হলো: মোনোসাইট, ম্যাক্রোফাজ়ের মতো কোষগুলো ছত্রাক-কণাগুলোকে গিলে ফেলে আর তার পর সেগুলোকে হজম করে ফেলে। এই গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, মোনোসাইটের এই গিলে ফেলার (বিজ্ঞানের পরিভাষায়, ফ্যাগোসাইটোসিস) প্রক্রিয়াটি যখন দুর্বল, তখনই মিউকরমাইকোসিসের আশঙ্কা বেশি।

Covid Update West Bengal : করোনার দৈনিক আক্রান্ত ৬ মাস পর বাংলায় আবারও ১০০ পার
দীপ্যমানের কথায়, “যে সব মিউকরমাইকোসিস রোগীর উপর পরীক্ষা চালিয়েছিলাম, তাঁদের ফ্যাগোসাইটোসিস অন্যদের চেয়ে বেশ কম সক্রিয় দেখা গিয়েছিল।”
অর্থাৎ, যে সব কোভিড রোগীর এই ধরনের সমস্যা ছিল, তাঁরাই সম্ভবত মিউকর সংক্রমণে কাবু হয়ে পড়েছিলেন বলে ব্যাখ্যা দিচ্ছেন গবেষক দলের অন্যতম, কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের মেডিসিন বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক কৌশিক বসু।

যদিও ওই গবেষকদের বক্তব্য, তাঁদের গবেষণাটি খুব কম সংখ্যক রোগীদের উপর করা হয়েছে, তাই ভবিষ্যতে আরও বেশি সংখ্যক রোগীকে নিয়ে দেশ জুড়ে একই রকম কাজ হওয়া উচিত। চিকিৎসকদের বক্তব্য, এই গবেষণালব্ধ ফলের সব চেয়ে ইতিবাচক দিক হলো,করোনা সংক্রামিতদের মধ্যে যাঁদের মিউকরের ঝুঁকি থাকে, তাঁদের মোনোসাইট, ম্যাক্রোফাজ়ের সক্রিয়তা কতটা, সেটা লাগাতার পর্যবেক্ষণে রাখলে আগে থেকে ছত্রাক সংক্রমণের আশঙ্কা সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যেতে পারে। সেই মতো আগাম ব্যবস্থাও নেওয়া যেতে পারে। তাতে একদিকে যেমন বাঁচার সম্ভাবনা বাড়ে, তেমনই কমে যায় বিপুল চিকিৎসাব্যয়ের ধাক্কা।

Corona Booster Dose : ৩ ডোজ়ের পরেও কি দরকার বুস্টার?
মিউকরের আখ্যান:
অসুখটা কী?
মিউকরমাইকোসিস আদতে একটি ছত্রাক সংক্রমণ, যা মানুষের নাক, চোখ, চোয়াল, সাইনাস ও কোনও কোনও সময়ে ফুসফুস ও মস্তিষ্কের কোষকে দ্রুত আক্রমণ করে।

কতটা ক্ষতিকর?
সাইনাস, চোখ, মাড়ি, মস্তিষ্ক ও ফুসফুসকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এই সংক্রমণ। ডায়াবিটিসে আক্রান্ত বা যাঁদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অত্যন্ত কম অথবা ক্যান্সার কিংবা এইচআইভি/এইড্‌স-এ আক্রান্তদের ক্ষেত্রে এই সংক্রমণ প্রাণহানি ঘটাতে পারে।

কোভিড রোগীদের ঝুঁকি কোথায়?
গুরুতর অসুস্থ কোভিড রোগীদের চিকিৎসায় সচেতন ভাবেই স্টেরয়েড প্রয়োগ করা হয় ফুসফুসকে বাঁচাতে। আর সেটাই কখনও কখনও কাল হয়ে দাঁড়ায় ছত্রাক সংক্রমণের ক্ষেত্রে। রোগীর দীর্ঘদিনের পুরোনো, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবিটিস থাকলে তা এই সংক্রমণের রাস্তাকে আরও প্রশস্ত করে।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Exit mobile version