সুরজিৎ জানিয়েছে, গত ১ মার্চ সুদানের রাজধানী খার্তুম পৌঁছন। এম টি এন টেলিকম কোম্পানি সফটওয়্যার এর কাজ করতেই সেখানে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু, ১৫ তারিখ থেকেই সেখানে আরএসএফ এবং সুদান আর্মির যুদ্ধ শুরু হয়। লাগাতার চলতে থাকে গুলিগোলা। যুদ্ধ শুরু হতেই তারা যে হোটেলে ছিলেন সেখানে লোডশেডিং শুরু হয়ে যায়। সারা দেশেই কারেন্ট ছিল না। প্রথম দিকে 12 দিন হোটেলের জেনারেটর এক ঘণ্টা দেড় ঘণ্টা করে চালানো হতো। পরে ডিজেল শেষ হয়ে যাওয়ায় তাও বন্ধ হয়ে যায়।
সুরজিৎ জানান, ”সবার আগে ফুরায় মোবাইলের চার্জ । বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় সবাই মারাত্নক চিন্তায় পড়েন। ধীরে ধীরে খাবার ও জলের স্টক শেষ হতেই খাদ্য ও জলের জন্য অন্য লড়াই শুরু হয়। যুদ্ধের মাঝে ফেঁসে তখন মনে হচ্ছিল আর বোধহয় বাড়ি ফেরা হল না।”
এরপরেই আতঙ্কিত ও মরিয়া হয়ে ওঠে সুরজিৎ এবং তাদের সঙ্গীরা। পালানোর পথ খুঁজতে থাকেন। তিনি জানান, সুদানে কয়েক ঘন্টার জন্য সিজ ফায়ার ঘোষণা হলেও জন্য তাও মানা হচ্ছিল না। সিজ ফায়ারের মধ্যেও অবিরাম গুলিবর্ষণ চলে। আমেরিকা সহ বিভিন্ন অ্যাম্বাসি তাদের দূতাবাস বন্ধ করে দেয়। পালানোর পথ খুঁজতে থাকেন সুরজিতরা। ভারতীয় দূতাবাসের কাছে তারা নিরাপদ ভাবে দেশে পৌঁছানোর পরামর্শ চান।
ভারতীয় দূতাবাসের সহায়তায় এবং তাদের দেখানো পথেই দেশে ফিরতে সক্ষম হয়েছেন সুরজিতরা। ৪৯ জন মিলে ভারতীয় মুদ্রায় দশ লক্ষ টাকারও বেশি অর্থে বাস ভাড়া করেন একেকজনের ৩০ হাজার টাকা করে বাস ভাড়া দিতে হয় । ৪৯ জন সেই বাসে করে জীবন বাজি রেখে ২৪ এপ্রিল রওনা হন পোর্ট সুদানে। ১২ ঘন্টা ভয়াবহ জার্নি করে তারা পোর্ট সুদানে পৌঁছন। মাঝেমধ্যেই বাস থামিয়ে তাদের চেকিং করছিল আরএসএফের সশস্ত্র জওয়ানরা।
সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে অশোকনগরের বাড়িতে বসে সুরজিৎ বলেন, ”মনে হচ্ছিল যেকোনও সময় গুলি করে দেবে। তার সব থেকে বড় সমস্যা হচ্ছে ভাষা। তারা অ্যারোবিক ছাড়া কিছুই বোঝেন না। যে কোন মুহূর্তে দু পক্ষের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি থেকে বচসা বাঁধলেই নিশ্চিত ছিল বুলেট।”
পোর্ট সুদান থেকে তাদের ভারতীয় দূতাবাস ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে তাদের সৌদি আরবের জেড্ডায় পৌঁছানো দেয়। সেখান থেকে অন্য আরেকটি বিমানে দিল্লি এসে পৌঁছয় তারা। বৃহস্পতিবার দিল্লি থেকে দমদম এয়ারপোর্টে পৌঁছন সুরজিৎ এবং তার কয়েকজন সঙ্গী। কিন্তু যে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি অশোকনগরের বাড়িতে ফিরেছেন। তাতে তার পরিবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ছেলেকে আর বিদেশে পাঠাবেন না।
সদ্যবিবাহিত সুরজিৎ বিয়ের একমাসের মাথায় এরকম পরিস্থিতিতে পড়ায় ঘুম উড়েছিল গোটা পরিবারের। কোনমতে প্রাণ হাতে নিয়ে বাড়িতে এসেছে ছেলে। তাঁকে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন সুরজিৎ এর মা ও স্ত্রী। একমাত্র ছেলেকে যে এত তাড়াতাড়ি ফিরে পাবেন সেটাই ভাবতে পারছিলেন না মা রীতা দে। ছেলের চিন্তায় এই কয়েকটা দিন ঘুমাতে পারেননি, খেতে পারেন নি বাবা স্বপন দেও। তবে ভারতীয় দূতাবাসের তৎপরতার জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন সুদান ফেরত সুরজিৎ এবং তাঁর পরিবার। সুরজিৎ জানান, এখনও প্রায় আড়াই হাজার ভারতীয় যুদ্ধবিধ্বস্ত সুদানে আটকে আছেন। শীঘ্রই তারাও ঘরে ফিরুক এই কামনাই করেন তিনি।