এই সময়, কাকদ্বীপ ও কলকাতা: হাতে ছিল রপ্তানির লাইসেন্স। আর সেটাকে কাজে লাগিয়েই বিশ্বজুড়ে বন্যপ্রাণ চোরাচালানের ব্যবসায় ঢুকে পড়েছিলেন দক্ষিণ ২৪ পরগনার ঢোলাহাটের বছর বত্রিশের সালাউদ্দিন মির। ২০১৬ সাল থেকে এখনও পর্যন্ত বিভিন্ন পাখির পালক ও দেহাংশ ক্যুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে পাচার করেছেন, রাজ্য ও কেন্দ্রীয় বনাধিকারিকদের অভিযোগ তেমনই। বাংলায় বসে চোরাকারবার করলেও বাংলার বাইরের পাখির দেহাংশও মজুত করেছিলেন সালাউদ্দিন। ফলে চোরাচালানের এই চক্র দেশ ও আন্তর্জাতিক পরিসরে যথেষ্ট সক্রিয়, এমনটাই সন্দেহ করা হচ্ছে। শুক্রবার আদালতে তোলা হলে একদিনের জেল হেফাজত হয়েছে তাঁর।

North 24 Parganas News : আন্তর্জাতিক পাচার চক্রের পর্দাফাঁস উত্তর ২৪ পরগনায়, উদ্ধার একাধিক ব্র্যান্ডের মোবাইল
যে ভাবে জালে সালাউদ্দিন
ওয়াইল্ডলাইফ ক্রাইম কন্ট্রোল ব্যুরোর (ডব্লিউসিসিবি) থেকে গোপন সূত্রে খবর পেয়ে যৌথ অভিযান চলে বৃহস্পতিবার রাতে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার এডিএফও চিন্ময় বর্মনের নেতৃত্বে নামখানা, রামগঙ্গা, ভগবৎপুর ও বারুইপুর রেঞ্জের বনকর্মীদের নিয়ে হানা দেওয়া হয় ঢোলাহাট, রামচন্দ্রনগর ও কাকদ্বীপে। ঢোলাহাট থানার বেজপুকুর গ্রামের বাড়ি থেকে বমাল গ্রেপ্তার করা হয় সালাউদ্দিনকে। ধৃতের শ্বশুর তৃণমূল নেতা তথা কাকদ্বীপ পঞ্চায়েত সমিতির মৎস্য কর্মাধ্যক্ষ। ভাই ঢোলাহাট থানার সিভিক ভলান্টিয়ার।

Durgapur News : আলোর দাপটে ঠিকানা হারাচ্ছে পাখিরা, দুর্গাপুরের গাছ থেকে এলইডি খোলার ভাবনা
সালাউদ্দিনের ‘সংসার’
সাদা গলার মাছরাঙার (হোয়াইট থ্রোট কিংফিশার) মৃতদেহ মিলেছে ৯৩৩টি। এই পাখি বাংলায় প্রচুর রয়েছে। কিন্তু বনাধিকারিকদের চিন্তা বাড়িয়েছে জংলি মুরগির এমন এক প্রজাতির (গ্রে অ্যান্ড রেড জাঙ্গল ফাউল) ৮৬৮টি মৃতদেহ ও দেহাংশ, যা বাংলায় পাওয়ার কথাই নয়। মূলত দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলি এবং কিছুটা রাজস্থান-গুজরাটে এদের দেখা মেলে। ফলে সন্দেহ করা হচ্ছে, সালাউদ্দিন ভিন্রাজ্য থেকেও পাখির মৃতদেহ ও দেহাংশ জোগাড় করতেন। পাওয়া গিয়েছে ১৬৮টি তিতরের (গ্রে ফ্র্যাঙ্কোলিন) দেহও। সব ক’টি পাখিই দেশের বন্যপ্রাণ আইনে সংরক্ষিত পর্যায়ভুক্ত।

Siliguri News : শিলিগুড়িতে অ্যাম্বুল্যান্সের ভেতর শায়িত কফিন, খুলতেই বেরিয়ে এল…
কারা চায় পাখির দেহাংশ?
দক্ষিণ ২৪ পরগনার ডিএফও মিলন মণ্ডলের বক্তব্য, প্রাথমিক জেরায় জানা যাচ্ছে, রাশিয়া, ব্রিটেন, ডেনমার্ক, কানাডা, আইসল্যান্ড, জাপান, বুলগেরিয়া, জার্মানি, নাইরোবি, কেনিয়া, চিলে – বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই পাখিগুলির পালক, কঙ্কাল পাচার করত সালাউদ্দিন। প্লাস্টিক ও কাগজের খামে ভরে ক্যুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে তা পাঠানো হতো বিদেশে। জিনিষগুলি ওজনে হালকা ও সহজেই কাপড়ের সামগ্রী দিয়ে মুড়ে ফেলা যায় – ফলে ক্যুরিয়ার সার্ভিসের লোকজনও সন্দেহ করত না।

Fake Milk: নকল দুধ, দইয়ে ছেয়ে বাজার! প্রোটিন ভেবে ‘বিষ’ খাচ্ছেন? কড়া ব্যবস্থা FSSAI-র
ভার্চুয়াল পথে বিকিকিনি
জানা যাচ্ছে, সোশ্যাল মিডিয়ায় বিভিন্ন নামে পেজ খুলে ঘুরপথে দরাদরি চলত, আবার হোয়াটসঅ্যাপের মতো একাধিক এনক্রিপ্টেড মেসেজিং সার্ভিসও ব্যবহার হয়েছে চোরাচালানের কাজে। বিদেশি মুদ্রায় দামও মেটানো হয়েছে।

কেন চাই এত পালক!
ডব্লিউসিসিবি-র পূর্বাঞ্চলীয় শাখার ডেপুটি ডিরেক্টর অগ্নি মিত্র জানাচ্ছেন, গ্রে অ্যান্ড রেড জাঙ্গল ফাউলের গলায় থাকা কালোর ওপর সাদা বা বাদামি ছিটের পালক বিদেশে কাজে লাগে মূলত মাছ ধরার ফাতনা তৈরি করতে। পালকের এই বিশেষ রংয়ে মাছেরা আকৃষ্ট হয়। আবার গ্রে ফ্র্যাঙ্কোলিন এবং সাদা গলার মাছরাঙার পালক মূলত ব্যবহৃত হয় ফ্যাশন দুনিয়ায়, ডিজাইনার পোশাক বানাতে। বন্যপ্রাণ সংরক্ষক জয়দীপ কুন্ডুর কথায়, ‘বন্যপ্রাণীর দেহাংশ দিয়ে পোশাক তৈরি করা বন্যপ্রাণ চোরাচালানের মতোই গর্হিত অপরাধ। অথচ ফ্যাশন দুনিয়ায় সেই সচেতনতা তৈরি হচ্ছে না।’



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Exit mobile version