অনির্বাণ ঘোষ

দফায় দফায় কেমোথেরাপি। লম্বা হাসপাতালবাসের ঝক্কি। আর অশক্ত শরীরে ক্রমাগত যন্ত্রণা সয়ে যাওয়া। এই তিনের ধকল সামলাতে গিয়ে পড়াশোনাটাই শিকেয় ওঠে ক্যান্সার-আক্রান্ত শিশু বা কিশোর-কিশোরীদের। তাদের একাংশের দু’-তিন বছর পর ক্যান্সার-মুক্তি হলেও অনভ্যাসের দরুণ অনেকেই স্কুলের মূলস্রোতে ফিরতে পারে না।

ওই সব কচিকাঁচার কথা ভেবেই পেডিয়াট্রিক ক্যান্সার রোগীদের অনলাইনে পড়াশোনা চালানোর ব্যবস্থা শুরু করেছিলেন কলকাতারই এক মহিলা চিকিৎসক। যাঁরা পড়াচ্ছিলেন, তাঁরাও ক্যান্সারজয়ী। উদ্দেশ্য ছিল, পড়াশোনার পাশাপাশি শিশুরোগী ও তাদের মা-বাবাদেরও মনোবল বৃদ্ধি। সেই প্রয়াসই উদ্ভাবনী ও বেনজির আখ্যা পেয়ে আদায় করে নিল একেবারে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি!

Free Cancer Treatment : বিনামূল্যে ক্যান্সারের চিকিৎসা! সপ্তাহে ৬ দিন তাম্রলিপ্ত মেডিকেল কলেজে বিশেষ পরিষেবা
সম্প্রতি নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের বেলফাস্টে আয়োজিত অ্যাসোসিয়েশন অফ ব্রেস্ট সার্জেন্‌স (ইউকে)-এর মঞ্চে ওই চিকিৎসক অগ্নিমিতা গিরি সরকারের হাতে ‘বার্সারি’ পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। পাশাপাশি, পার্ক সার্কাসের ইনস্টিটিউট অফ চাইল্ড হেল্‌থে (আইসিএইচ) চিকিৎসাধীন ৪৮২ জন পেডিয়াট্রিক ক্যান্সার রোগী ও তাদের অভিভাবকদের ক্ষেত্রে তাঁদের এই অসামান্য সাফল্যগাথা সম্প্রতি প্রবন্ধ আকারে ছাপাও হয় ইউরোপিয়ান জার্নাল অফ সার্জিক্যাল অঙ্কোলজি নামে বিখ্যাত বিজ্ঞানপত্রিকায়।

অগ্নিমিতার কথায়, “জুন হলো ক্যান্সারজয়ীদের জন্য নিবেদিত মাস। সেই ক্যান্সার সার্ভাইভার মান্থে এমন স্বীকৃতি আমাদের দায়িত্ব আরও বাড়িয়ে দিলো, তাতে সন্দেহ নেই। ওঁরা আমাদের কাজকে পেডিয়াট্রিক ক্যান্সার-রিহ্যাবের মডেল হিসেবে বিবেচনা করেছেন।”

Hair Donation : ক্যান্সার রোগীদের জন্য বাড়ালেন সাহায্যের হাত! নিজের চুল দান করলেন আলিপুরদুয়ারের গৃহবধূ
নিজে পেশায় শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ। কিন্তু স্বামী ব্রেস্ট ক্যান্সারের বিশেষজ্ঞ সার্জেন দীপ্তেন্দ্র সরকারের কল্যাণে বহু ক্যান্সারজয়ী মহিলাই অগ্নিমিতার আপনজন। তাঁদের নিয়েই তিনি ‘দিশা ফর ক্যান্সার’ নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন চালান। সেই সংগঠনের সদস্যরা পালা করে অনলাইনে পড়ান আইসিএইচ-এর মৃণালিনী ক্যান্সার সেন্টারে ভর্তি, ক্যান্সারে আক্রান্ত শিশুরোগীদের।

যারা মূলত অ্যাকিউট লিম্ফোব্লাস্টিক লিউকেমিয়ার মতো ব্লাড ক্যান্সারের পাশাপাশি অন্য নানা ক্যান্সারের শিকার। ক্রমে গড়ে ওঠে মৃণালিনী ক্যান্সার রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার। আইসিএইচ-এর অধিকর্তা, প্রবীণ শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অপূর্ব ঘোষ বলেন, “ছোটদের পড়াশোনা ও মনোবল চাঙা করার পাশাপাশি তাদের মা-বাবাদের মনে সাহস জোগানোর যে কাজ ওঁরা করে চলেছেন, তার জন্য কোনও প্রশংসাই যথেষ্ট নয়।”

WB Panchayat Election : জরায়ুর ক্যানসার সঙ্গী করে ভোটে সিপিএমের কৃষ্ণা
অগ্নিমিতা জানান, তাঁরা ক্যান্সার আক্রান্তদের তিনটি গোষ্ঠীতে ভাগ করে নিয়েছিলেন। ৬ বছরের কম, ৬-১২ বছর এবং ১২ বছরের বেশি। কারণ, এই তিনটি বয়সে ছোটদের মানসিক অবস্থা ও বোধের ফারাক থাকে যথেষ্ট। এদের মধ্যে সব চেয়ে ছোটরা বুঝতেই চায় না, মা-বাবা তাকে হাসপাতালে এনে রোজ কেন এত কষ্ট দিচ্ছে! রোগের গুরুত্বটাই বোঝে না তারা, বোঝার কথাও নয় এমনিতে।

ফলে, মা-বাবার সঙ্গে সন্তানের মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়। আর একটু বড় যারা, তারা কিছুটা বোঝে। কিন্তু নিয়মিত সুচ, ইঞ্জেকশন, স্যালাইনের ধকল নিতে নিতে মানসিক ভাবে নেতিয়ে পড়ে তারা। আর একটু বড় যারা, তাদের মধ্যে তৈরি হয় অবসাদ।

West Bengal Panchayat Election : MSC ফার্স্ট ক্লাস! পঞ্চায়েত নির্বাচনে লড়ছেন হাওড়ার সর্বকনিষ্ঠা প্রার্থী ঝিন্দন
সেই সব ক’টা মানসিক বাধাবিপত্তি দূর করার পাশাপাশি তাদের পড়াশোনাতেও যত্ন নেন দিশা ফর ক্যান্সার-এর ক্যান্সারজয়ী মহিলারা। তাঁদের ক্যান্সারকে জয় করার কাহিনি উদ্বুদ্ধ করে ক্যান্সার আক্রান্ত শিশু ও কিশোর-কিশোরী এবং তাদের অভিভাবকদের। আর বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, মনোবল বাড়লে তো চিকিৎসায় নিরাময়ের রাস্তাটাও চওড়া হয়ে ওঠে এমনিতেই!



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Exit mobile version