অশোকনগরের কৃতি সন্তানের জন্যই সফলভাবে চাঁদে নামতে সক্ষম হয়েছে চন্দ্রযান তিন এর ল্যান্ডার বিক্রম! ভারতের চাঁদ জয়ের ইতিহাসে তাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় রয়ে গেলেন অশোকনগরের বিমল ভট্টাচার্যের। ইতিমধ্যেই রাজ্যে যে সকল বৈজ্ঞানিকের নাম চন্দ্রযান ৩ সফল হতেই উঠে এসেছে, তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন উত্তর ২৪ পরগনা জেলার অশোকনগর এর বাসিন্দা, বর্তমানে ইসরোর স্পেস অ্যাপ্লিকেশন সেন্টার আমেদাবাদের এর গ্রুপ ডিরেক্টর বিমল ভট্টাচার্য।

চন্দ্রযান দুই এর ল্যান্ডার চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়ে যেখানে অসফল হয়, সেই তথ্য সংগ্রহ করে তা বিশ্লেষণ করে চাঁদের কোন জায়গায় নামলে, সুরক্ষিত সফলভাবে ল্যান্ডিং করতে পারবে বিক্রম তা নির্বাচন করে দেন সয়েল টেস্টের মাধ্যমে অশোকনগরের কৃতি এই বৈজ্ঞানিক বিমল ভট্টাচার্যই । দীর্ঘ সময় ধরে ইসরোর হয়ে কাজ করলেও এ বিষয়ে ঘুণাক্ষরেও কেউ টের পাননি অশোকনগর বাসীরা। তবে চন্দ্রযান তিন সফল হতেই অবশেষে প্রকাশ্যে আসল বিমল বাবুর নাম আর তাতেই ভারতের চন্দ্র অভিযানের অন্যতম নায়ক হয়ে উঠলেন পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার অশোকনগরের বাসিন্দা বিমল ভট্টাচার্য। এই খবর প্রকাশ্যে আসতেই আবেগে ভেসেছে অশোকনগর বাসীরা।
Chandrayaan 3 Update : এখন‌ও লক্ষ্য পূরণ হয়নি, চন্দ্রযান ৩-এর বাকি রয়ে যাওয়া মিশন নিয়ে মুখ খুলল ইসরো

বিমল বাবুর ছোটবেলা কেটেছে অশোকনগরে। বাবা প্রমথনাথ ভট্টাচার্য ছিলেন অশোকনগর বয়স সেকেন্ডারি স্কুলের সংস্কৃতের প্রথম পন্ডিত। সেই স্কুলেই পড়াশোনা করেন ছেলে বিমল ভট্টাচার্যও। অশোকনগর কল্যাণগড় পৌরসভার ১১ নম্বর ওয়ার্ডের শক্তি সাধনা ক্লাব এলাকায় পৈত্রিক বাড়িতে তাই এখন খুশির আমেজ। এলাকার বহু মানুষজন এখন শুভেচ্ছা অভিনন্দন জানাতে আসছেন ভট্টাচার্য বাড়িতে। দাদা শ্যামল কুমার ভট্টাচার্য সকলকেই ভাইয়ের বিষয়ে নির্দ্বিধায় গর্বের সঙ্গেই উত্তর দিচ্ছেন সমস্ত প্রশ্নের। ছেলের এই সাফল্যে আজ খুশি বছর ৯৬ এর বিমল বাবুর মা, শেফালী ভট্টাচার্যও। অশোকনগর বয়েজ সেকেন্ডারি স্কুল থেকে বিমলবাবু ১৯৮২ সালে মাধ্যমিক পাস করেন এবং ১৯৮৪ সালে তিনি সাইন্স নিয়ে উচ্চ মাধ্যমিকও পাস করেন। এরপরে বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করে নিউ দিল্লি এগ্রিকালচারাল ইনস্টিটিউট থেকে এমএসসি এবং পিএইচডি করেন। কর্মব্যস্ত জীবনে প্রতিবছর সময় করে আসেন অশোকনগরের বাড়িতে। গত বছর ডিসেম্বরে শেষ এসেছিলেন অশোকনগরে। তারপর থেকেই চূড়ান্ত ব্যস্ত হয়ে পড়েন চন্দ্রযান ৩-এর প্রস্তুতি কাজে।
Rover Pragyan On Moon : ‘বিক্রম’ বিজয়ের পর ‘প্রজ্ঞান’-এর মুনওয়াক! কী ভাবে ধুলোর ঝড় সামলে উঠল চন্দ্রযান ৩-এর রোভার?

এবার আসা যাক ভারতের চন্দ্র অভিযানের অজানা বিষয়ে। মহাকাশ পার করে সফলভাবে চাঁদে পা রাখতে মুখ্য ভূমিকা পালন করে অরবিটার ও ল্যান্ডার। অরবিটার মাটিতে নামে না, প্ল্যানেটের চারদিকে ঘোরে। প্রসঙ্গত, বলে রাখা ভালো, এখনও চন্দ্রযান ২-এর অরবিটর ঘুরে যাচ্ছে মহাকাশে। আর সেই অরবিটার থেকেই এখনও ছবি মিলছে ইসরোর বিজ্ঞানীদের। আর সেই ছবি সংগ্রহ করে, চন্দ্রযান তিনের ল্যান্ডার বিক্রমের প্রোগ্রামিং সিস্টেমের মধ্যে পুট করে এআই দ্বারা এমনভাবে সেট করা হয়েছে তাকে, যেখানে ফেস ডিটেকশন সিস্টেম এর মত পরিস্থিতির বিচার করে ছবি অ্যানালাইসিস করে জায়গা নির্বাচন করতে পারে বিক্রম। চাঁদের কাছাকাছি গিয়ে পৌঁছানোর পরে হোভারিং মোডে গতি কম করে নামার সময় পুরনো ওই ইমেজের সঙ্গে কম্পেয়ার করে বুঝে দেখে কোথায় সমতল জায়গা এবং সেখানে সুরক্ষিতভাবে নামা যেতে পারে। তবে, চাঁদে পা রেখেই কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই কাজ শুরু করে না ল্যান্ডার।
Moon Pictures By Chandrayaan 3 : টাটকা তাজা চাঁদের ছবি! দেখুন চন্দ্রযান ৩-এর পাঠানো নয়া ভিডিয়ো

জানা যায়, লুনার ডাস্ট থিতিয়ে পড়ার জন্য প্রায় চার ঘন্টার অধিক সময় অপেক্ষা করে বিক্রম। এরপরে ধীরে ধীরে ফোল্ডিং র‍্যাম্প খুলে চাঁদের মাটিতে বেরিয়ে আসে রোভার প্রজ্ঞা। ইসরো থেকে তা কন্ট্রোল করা হলেও, কিছু প্রোগ্রামিং আগে থেকেই সেট করা ছিল প্রজ্ঞায়। তবে জানার বিষয়, ইসরোর থেকে করা কন্ট্রোলিং সিগন্যাল পৌঁছতে প্রায় দেড় সেকেন্ড দেরি হয় চাঁদে। তাই তাৎক্ষণিক ক্রিয়া গুলি আগে থেকে প্রোগ্রামিংয়ের মাধ্যমে সেট করা থাকলেও, ইসরোর থেকেও পরিচালনা করা হয়ে থাকে ল্যান্ডারকে।

অপরদিকে, চাঁদের এক দিন মানে ধরে নেওয়া হয় পৃথিবীর ১৪ দিন। ফলে ১৪ দিন রাত ও ১৪ দিন দিন ধরে চন্দ্রযান তিনের ল্যান্ডিং সময়ে চূড়ান্ত করা হয়। এমনিতেই চাঁদের ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা সাধারণ ভাবেই অনেকটা কম থাকে দিনে। রাতে সেই তাপমাত্রা আরও চূড়ান্ত ভাবে কমে যায়। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে পাওয়ার সাপ্লাই এর একমাত্র মাধ্যম সোলার প্যানেল। যদি প্রথম দিন চাঁদের বুকে নামা যায় তবে ১৪ দিন সময় থাকে ঘুরে ফিরে তথ্য সংগ্রহ করার জন্য। তাই ২৩ আগস্ট নির্বাচন করা হয়েছিল কারণ অন্ধকারাচ্ছন্ন ১৪ দিন কাটিয়ে ওটাই ছিল প্রথম দিনের (লুনার ডে)। ফলে হাতে অতিরিক্ত সময় পাওয়া গেল চাঁদকে জানার। আর এতেই সোলার পাওয়ার যেমন পাওয়া গেল পাশাপাশি সামনের বাধা এড়িয়ে ছবি তোলার সঙ্গে নানা জায়গা ঘুরে দেখতেও সক্ষম হচ্ছে প্রজ্ঞা। কিন্তু এই ১৪ দিন পর চাঁদের তাপমাত্রা এতটাই কমে যায় যে সেখানে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির যন্ত্রাংশ সহ লিথিয়াম ব্যাটারিও প্রায় নষ্ট হয়ে গিয়ে কাজ করা বন্ধ করে দেয়। এক্সট্রিম লো টেম্পারেচারে সেন্সরও অকেজো হয়ে যায়। ১৪ দিনের এই লম্বা রাতের (১৪×২৪ ঘণ্টা) পর একবার পাওয়ার অন করার চেষ্টা করা হয় থাকে। এক্ষেত্রেও হয়তো তেমন চেষ্টা চালাবেন বিজ্ঞানীরা।
Chandrayaan-3 New Moon Video : ‘ইয়াহু কী মজা’, বিক্রমের থেকে মুনওয়াকের অনুমতি মিলতেই উচ্ছ্বসিত প্রজ্ঞান

তবে চন্দ্রযান তিনের ল্যান্ডার বিক্রম ও প্রজ্ঞা তাদের বিশেষ সেন্সরের মাধ্যমে চাঁদের মাটির প্রকৃতি বিশ্লেষণ ও ডিপ সয়েল অ্যানালাইসিস করবে স্পেক্ট্রোমিটার সহ বিভিন্ন ধরনের রে মাটির মধ্যে দিয়ে। সেন্সরের সাহায্যে মাটির প্রকৃতি বৈশিষ্ট্য গুলিও বিশ্লেষণ করা হবে। তাতেই বোঝা যাবে মিনারেলের কি এরকম অস্তিত্ব আছে, সয়েল ডেনসিটি কতটা আছে, সলিড সয়েল কতটা আছে এবং কোন লিকুইড সয়েল অর্থাৎ ম্যাগমা আছে কিনা তাও পরীক্ষা করে বোঝা যাবে। এবং সেই ফিডব্যাক গুলি ইসরো-কে পাঠাবে প্রজ্ঞা-বিক্রম। তার থেকেই পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে উঠে আসবে চাঁদকে নিয়ে নানা-অজানা তথ্য।

Chandrayaan 3 Update Today : চাঁদে চাররাত কাটিয়ে কেমন আছে প্রজ্ঞান? হাড়কাঁপুনি ঠান্ডায় আজ তার কী কাজ?
চন্দ্রযান ৩-এর মিশন অবজেক্টিভবের প্রথম ধাপ ছিল সফলভাবে ল্যান্ডিং। চাঁদের দক্ষিণ মেরুর অসমতল জমিতে গিয়ে সফলভাবে ল্যান্ডিং করাই ছিল ভারতের কাছে ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। পরবর্তী দ্বিতীয় ধাপে ছিল ২৬টি ডিপ্লয়মেন্ট ফিচার। তার মধ্যে রয়েছে সোলার প্যানেল ডিপ্লয়মেন্ট, র‍্যাম ডিপ্লয়মেন্ট, রকেটের মাধ্যমে চন্দ্রযান এর যাত্রা পথের ২৬ টি পার্ট (পর্যায়) কে সফলভাবে খোলার। তাতেও সফল হয় চন্দ্রযান তিন। এরপর সয়েল ইনভেস্টিগেশন ও বিভিন্ন ধরনের গ্যাস, কি রকম আবহাওয়া পরিস্থিতি থাকে সে বিষয়ে সঠিকভাবে তথ্য মিললে তবেই পুরোপুরি ভাবে সম্পন্ন হবে চন্দ্রযান ৩-এর ইসরোর মিশন।

চন্দ্রযান টু এর অরবিটর এখনও ঘুরছে বিনা জ্বালানিতেই। মহাকাশে তার ঘুরতে কোন জ্বালানির প্রয়োজন হচ্ছে না। গ্রাভিটির ফোর্সের কারণেই মহাকাশে এখনও ঘুরে বেড়াচ্ছে চন্দ্রযান টু এর অরবিটর। ফলে ভারতের চন্দ্রযান তিন এর মাধ্যমে চাঁদ জয়ের ক্ষেত্রে, চন্দ্রযান তিনের অরবিট এর পাশাপাশি চন্দ্রযান দুয়ের অরবিটর কেও ব্যবহার করে ডবল চ্যানেল লিংক এস্টাবলিস্ট করা হয়েছে। আর এতেই ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে সংযোগ করতে বাড়তি সুবিধা হয় ইসরোর। তবে চাঁদের অজানা দক্ষিণ মেরুতে বিক্রমের নামার ক্ষেত্রে ডিপ স্পেস নেটওয়ার্ক শেয়ার এর মধ্যে দিয়ে বিশেষ সুবিধা মেলে ল্যান্ডারের সঙ্গে সংযোগ বজায় রাখতে। আরও জানা যায়, তামিলনাড়ুর কিছু জায়গার সয়েল লুনার(চাঁদের) শয়েলের সঙ্গে খানিকটা হলেও মেলে বলে অনুমান। সেই সয়েল বস্তা করে নিয়ে আসা হয় মহেন্দ্র গিরির রিসার্চ সেন্টারে। ভ্যাকুয়াম চেম্বার এর ভিতরে লুনার সয়েল দিয়ে ল্যান্ডারকে ল্যান্ড করানোর লেন্ডিং টেস্টও করা হয় চন্দ্রযান তিনের ক্ষেত্রে। এভাবেই চূড়ান্ত স্থান নির্বাচন করা হয় চন্দ্রযান সফল ভাবে চাঁদের মাটি ছোঁয়ার।
Moumita Dutta Space Scientist: মঙ্গল থেকে চাঁদ! ‘মিশন ইমপসিবেল’-কে সাকসেসফুল করা বিজ্ঞানী মৌমিতাকে চেনেন?

ইতিমধ্যেই রাজ্য সরকারের তরফেও যোগাযোগ করা হচ্ছে চন্দ্রযান তিনের সফল ল্যান্ডিংয়ের অন্যতম নায়ক বৈজ্ঞানিক বিমল ভট্টাচার্যের অশোকনগরের পরিবারের সঙ্গে। স্থানীয় বিধায়ক নারায়ণ গোস্বামীর তরফ থেকেও খোঁজ খবর নেওয়া হচ্ছে বিশদে। আগামী দিনে বৈজ্ঞানিক বিমল ভট্টাচার্য অশোকনগরে পা রাখলে তাকে বিশেষ সংবর্ধনা দেওয়ারও পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলেই জানা গিয়েছে। তবে অশোকনগরের কৃতী এই সন্তানের কথা ইতিমধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে ভাইরাল। ভারতের সফল চন্দ্রযান তিনের ইতিহাসে বৈজ্ঞানিক বিমল ভট্টাচার্যকে নিয়ে যেন তাই বাড়তি গর্ব অনুভব করছে অশোকনগরবাসীরাও।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Exit mobile version