মণিপুষ্পক সেনগুপ্ত

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মস্থান শান্তিনকেতন! বিবেকানন্দের পদবী ঠাকুর! মাতঙ্গিনী হাজরা নাকি থাকতেন অসমে! এমন সব মারাত্মক ভুলের পুনরাবৃত্তি থেকে নিষ্কৃতি চাইছেন বঙ্গ-বিজেপি নেতৃত্ব। তাই লোকসভা ভোটের প্রস্তুতি বৈঠকে এ বিষয়ে বাড়তি সতর্কতা নিয়েছেন তাঁরা। লোকসভা ভোটের প্রচারে দলের কেন্দ্রীয় নেতারা বাংলায় এলে তাঁদের ভাষণের খসড়া এ রাজ্য থেকেই তৈরি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বঙ্গ-বিজেপি নেতৃত্ব।

অর্থাৎ, বাংলায় ভোট প্রচারে এসে নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহ অথবা জগৎপ্রকাশ নাড্ডারা কোন কোন বিষয়ের উপর জোর দেবেন, তা সাজিয়ে-গুছিয়ে দেওয়া হবে রাজ্য বিজেপি থেকেই। সেই খসড়া তৈরির ভার বর্তেছে বঙ্গ-বিজেপির মুখপাত্র শমীক ভট্টাচার্যের উপরে। মঙ্গলবার লোকসভা ভোটের প্রস্তুতি সারতে নিউ টাউনের একটি পাঁচতারা হোটেলে বৈঠকে বসেছিলেন রাজ্য বিজেপির পদাধিকারীরা। ছিলেন দলের কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক মঙ্গল পাণ্ডেও।

সেখানেই শমীককে ডেকে তাঁর দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে গেরুয়া শিবির সূত্রের খবর। শমীকের এই গুরুদায়িত্বের পোশাকি নাম দেওয়া হয়েছে ‘টকিং পয়েন্ট প্রমুখ’। বিধানসভা ভোটের প্রচারে বাংলায় এসে রবীন্দ্রনাথের জন্মস্থান শান্তিনিকেতন বলে দাবি করেছিলেন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি জেপি নাড্ডা। জঙ্গলমহলে ভোট প্রচারে গিয়ে সেই নাড্ডাই বিরসা মুন্ডার মূর্তিতে মালা দিতে গিয়ে অবলীলায় অন্য একজনের মূর্তিতে মালা পরিয়ে ফেলেছিলেন।

২০২১-এ দিল্লির লাল কেল্লা থেকে স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে বিপ্লবী মাতঙ্গিনী হাজরাকে অসমের বাসিন্দা বলে উল্লেখ করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। এখানেই শেষ নয়। এ রকম ভুলের উদাহরণ আরও আছে। যেমন নবদ্বীপে বিধানসভা ভোটের প্রচারে গিয়ে বিবেকানন্দকে ‘বিবেকানন্দ ঠাকুর’ বলে সম্বোধন করেছিলেন নাড্ডা। এমনকী রবীন্দ্রনাথের কবিতার কয়েকটি লাইনের বিকৃত উচ্চারণের জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকেও তখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রোলের মুখে পড়তে হয়েছিল।

বিধানসভা নির্বাচনের মুখে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বর এইসব হরকতে যথেষ্ট বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছিল বাংলার বিজেপি নেতাদের। কারণ সোশ্যাল মিডিয়ায় বিজেপি নেতাদের এই সব মন্তব্যকে হাতিয়ার করেই প্রচারের ঝড় তুলেছিল তৃণমূল। বাংলার সাধারণ মানুষও ভিন রাজ্যের বিজেপি নেতাদের এই ভুলগুলি ভালো ভাবে নেননি। বিধানসভা ভোটের দলের ভরাডুবির কারণ পর্যালোচনা করার সময়েও এই বিষয়গুলি উঠে এসেছিল গেরুয়া শিবিরের আলোচনায়।

রাজ্য বিজেপির অনেকেরই অভিমত, বিজেপি বাঙালি বিরোধী— তৃণমূলের এই প্রচার সাধারণ মানুষের কাছে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছিলেন মোদী-শাহ-নাড্ডারাই। এক বিজেপি নেতার কথায়, ‘রাজনীতির বাইরে আমাদের একটা সামাজিক জীবন রয়েছে। কেন্দ্রীয় নেতাদের এ সব বক্তব্যের জন্য আমাদের রীতিমতো টিটকিরির মুখে পড়তে হয়েছিল তখন।’

Lok Sabha Election 2024 : বিরোধীদের টেক্কা! জানুয়ারিতেই লোকসভা ভোটের প্রার্থী তালিকা চূড়ান্তের সিদ্ধান্ত BJP-র
বিজেপির বিরুদ্ধে বহু বছরের অভিযোগ যে, তারা বাংলা এবং বাঙালির সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। বাঙালির ভাবাবেগ সম্পর্কে দিল্লির বিজেপি নেতাদের কোনও ধারণা নেই বলেও ঘনিষ্ঠ মহলে আক্ষেপ করতে দেখা যেত এ রাজ্যের অনেক গেরুয়া নেতাকে। বিধানসভা ভোটের আগে দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের ভাষণে তা আরও একবার প্রমাণিত হয়েছে বলে মনে করছেন তাঁরা।

এ বার তাই দলীয়স্তরে সিদ্ধান্ত হয়েছে দলের শীর্ষ কেন্দ্রীয় নেতারা নির্বাচনী প্রচারে বাংলায় এসে কী বলবেন, তার খসড়া তৈরি করে দেবেন শমীক। যাতে কোনও বিকৃত বা ভুল তথ্য না বেরিয়ে যায় নাড্ডাদের মুখ ফসকে। শুধু বিকৃত অথবা ভুল তথ্যই নয়, বিধানসভা ভোটের মুখে বিভিন্ন জনসভা থেকে মোদীর মুখে ‘দিদি দিদি’ ডাকও বাংলার মানুষ ভালো ভাবে নেননি বলে ধারণা বঙ্গ-বিজেপির একাংশের।

দলের এক প্রবীণ নেতার কথায়, ‘নরেন্দ্র মোদীর মাতৃভাষা গুজরাটি। তাঁর পক্ষে কিছুতেই বোঝা সম্ভব নয়, কোন শব্দ কী ভাবে উচ্চারণ করলে বাংলার মানুষের মনে কী প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। মমতাকে লক্ষ্য করে ওঁর দিদি…দিদি…ডাকে উল্টো ফলই হয়েছিল, এতে কোনও সন্দেহ নেই। বাংলার মানুষের কাছে ওই ডাক অশ্লীল মনে হয়েছিল।’ লোকসভা ভোটের প্রচারে এসে ফের যাতে ‘দিদি…দিদি…’ ধরনের কোনও বিতর্ক বঙ্গ-রাজনীতিতে তৈরি না হয়, সেটাও শমীকের দেখার কথা বলে বিজেপি সূত্রে খবর।

Lok Sabha Election 2024 : রাজ্যের ৬ আসনে জয় সম্ভব? ভোটকুশলীদের দিয়ে সমীক্ষা
পদ্ম-শিবিরের এক গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক নেতার কথায়, ‘ভোট যত এগিয়ে আসবে, নেতাদের ভাষণবাজিও তত বাড়বে। কোনও সন্দেহ নেই, নেতাদের ভাষণ যাতে বাড়বে পাল্লা দিয়ে তাঁদের মুখ থেকে বেরিয়ে আসবে ভুল ও বিকৃত তথ্যও। সে সব এড়াতেই সব রাজ্যেই একজনকে টকিং পয়েন্ট তৈরির ভার দেওয়া হয়েছে। বাংলায় যেমন শমীক।’ এখন দেখার শমীকের সৌজন্যে বাংলায় বিতর্কহীন নির্বাচনী প্রচার সারতে পারেন কি না নাড্ডারা।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Exit mobile version