প্রশান্ত ঘোষ, ভাঙড়
২০০৯ সাল। যাদবপুরের তৃণমূল প্রার্থী কবীর সুমন সিপিএম প্রার্থী সুজন চক্রবর্তীকে হারিয়ে জিতেছিলেন প্রায় ৫৬ হাজার ভোটে। তিনি ভাঙড় থেকে লিড পেয়েছিলেন ১১ হাজার ভোট। ২০১৪ সালে সুজনকে হারিয়ে সংসদে যান সুগত বসু। এ বার ভোটের ব্যবধান বেড়ে হয় এক লক্ষ ২৫ হাজার। শুধু ভাঙড় বিধানসভায় তৃণমূলের লিড ৬৩ হাজার।২০১৯ সালে লোকসভা নির্বাচনে মিমি চক্রবর্তী বিজেপির অনুপম হাজারাকে হারান প্রায় ২ লক্ষ ৯৫ হাজার ভোটে। সেবার ভাঙড় থেকে মিমির লিড ছিল এক লক্ষ ১২ হাজার। অর্থাৎ যাদবপুরের তৃণমূল প্রার্থীরা ছ’টি বিধানসভায় মোট যত লিড পেয়েছেন, ভাঙড় একাই তত ভোটের লিড দিয়েছে শাসককে। সৌজন্যে আরাবুলে ইসলামের ভোট মেশিনারি।

এ বার লোকসভা নির্বাচনের অনেক আগেই আরাবুল জেলবন্দি। বারবার আদালতে তাঁর জামিনের বিরোধিতা করেছে খোদ রাজ্য সরকারের পুলিশই। ভাঙড়ের পর্যবেক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন ক্যানিং পূর্বের বিধায়ক শওকত মোল্লা। আরাবুলের অনুপস্থিতিতে শওকত একাই পারবেন নাকি ভাইজানের দল তাঁকে দশ গোল দেবে এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে দলের অন্দরে।

বাম জমানায় ২০০৬ সালে বিধায়ক হওয়ার তিন বছর পর ২০০৯ সাল থেকে শুধু ভাঙড় নয়, কলকাতা পুরসভা নির্বাচন, বিধাননগর পুরভোটেও কাজ করেছে আরাবুলের বিখ্যাত ভোট মেশিনারি। আরাবুলের পারফরম্যান্সে খুশি হয়ে ভোটে জেতার পর হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সুগত বসু বলেছিলেন, ‘আরাবুলের একটা রাজনৈতিক ইতিহাস আছে।’

কিন্তু সেই ইতিহাস অস্তগামী। তৃণমূলের নিচুতলার কর্মীদের আশঙ্কা, এ বারের লোকসভা ভোটে কাজ করবে না আরাবুলের ভোট মেশিনারি। বিশেষ করে ভাঙড়ের প্রতিটি অঞ্চলে আরাবুলের যে নিজস্ব টিম আছে তা এ বার এক প্রকার নিষ্ক্রিয়। ভাঙড়-২ ব্লকের ১০টি অঞ্চলেই কম বেশি কর্তৃত্ব চলত আরাবুলের।

আরাবুল অনুগামীদের দাবি, ‘দাদা’ গ্রেপ্তার হওয়ার পর শানপুকুর অঞ্চলের ভোট মেশিনারি বলে পরিচিত মহসিন, চালতাবেড়িয়া এলাকায় ওহিদুল, জামাই, নিজাম, ভোগালি-১ অঞ্চলে প্রবীর, পিন্টু, ভোগালি-২ এ মোদাসের, ভগবানপুর অঞ্চলে বাপি, পোলেরহাট-১ এ মাস্টার সবাই চুপচাপ। অভিযোগ, শওকতের ডাকা প্রতিটি সভা, মিছিলে গেলেও আরাবুল যে ভরসা জোগাতেন সেটা এখনও মিলছে না নিচুতলার কর্মীদের।

কেন মিলছে না, তারও ব্যাখ্যা দিয়েছেন দাদার ছায়া সঙ্গী ফিরোজ, আলমগিররা। তাঁদের বক্তব্য, ‘প্রতিটি ভোটের সময় দাদা নিয়ম করে ছ’টা-সাড়ে ছ’টায় ঘুম থেকে উঠে বাড়িতে বৈঠক করতেন। প্রতিদিন তাঁর বাড়িতে একশো থেকে দেড়শো কর্মী সমর্থক উপস্থিত থাকত পরামর্শ নেওয়া, অভাব অভিযোগ জানানোর জন্য। সকাল দশটা নাগাদ তিনি যখন পঞ্চায়েত সমিতির অফিসে যাওয়ার জন্য রওনা দিতেন তখন রাস্তাতেই চায়ের দোকান, দলীয় কার্যালয়, ক্লাবে বসে কর্মীদের সঙ্গে ভোট নিয়ে কথা বলতেন। বিকেল চারটের পর অফিস থেকে বেরিয়ে সোজা চলে যেতেন হাতিশালার তিন-চারটে দলীয় কার্যালয়ে। সব সেরে যখন রাত দশটায় বাড়ি ফিরতেন তখনও বাড়িতে অপেক্ষা করতেন কিছু মানুষ।’

ভোটের ৩ দিন আগে CBI তলব, ‘রাজনৈতিক চক্রান্ত’, দাবি শওকতের

দলের কর্মীদের অভিযোগ, শওকতকে পাওয়া যাচ্ছে শুধু সভা-মিছিলে। আর তাঁর চারপাশে নিরাপত্তারক্ষী ও ঘনিষ্ঠদের এত ভিড় যে সেখানে পাত্তাই পাচ্ছেন না নিচুতলার কর্মীরা। আরাবুল ঘনিষ্ঠ তাইজুল মোল্লার দাবি, ‘বুথে চাটাই পাতার খরচ থেকে শুরু করে কর্মীদের টিফিন, থানা পুলিশ ম্যানেজ করা, ‘মশলাপাতি’ সাপ্লাই দেওয়া সবই নির্দ্বিধায় করতেন দাদা। শুধু বলতেন, লড়তে হবে, পিছিয়ে এলে হবে না। এ বার সেই ভরসা পাচ্ছি না।’

যদিও আরাবুলের অভাব মানতে নারাজ ভাঙড়ের দায়িত্বে থাকা তৃণমূল বিধায়ক শওকত মোল্লা। তাঁর বক্তব্য, ‘কারও একার ভরসায় তৃণমূল লড়াই করে না। দলীয় ভাবে লড়েই তৃণমূল ভাঙড় থেকে ৫০ হাজার ভোটের লিড পাবে।’



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Exit mobile version