এই সময়, মেদিনীপুর ও কলকাতা: রোজ সকালে নিয়ম করে ফোনটা আসত মেদিনীপুরে শরৎপল্লির বাড়িতে। বুধবার আসেনি। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে শেষমেশ স্বামীকে ফোন করেন অন্তরা পট্টনায়ক। সাধারণত একবার কল করেই সাড়া মেলে স্বামীর, বুধবার মেলেনি। আরও কয়েকবার কল করেও সাড়া না মেলায় মনে তখনই কু ডেকেছিল অন্তরার। কিন্তু তাঁর পরিণতি যে এমন হবে, দুঃস্বপ্নেও তা ভাবেননি তিনি।শেষ পর্যন্ত বাড়িতে খবর এলো, কুয়েতের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ গিয়েছে অন্তরার স্বামী দ্বারিকেশ পট্টনায়কের (৫২)। কখনও দ্বারিকেশের বন্ধুকে, কখনও স্বামী যে সংস্থায় কাজ করতেন, সেখানে বারবার ফোন করে অন্তরা জানতে চেয়েছেন খবরটা ভুল কি না। বৃহস্পতিবার পশ্চিম মেদিনীপুরের জেলা প্রশাসনও জানিয়ে দিয়েছেন, বেঁচে নেই দ্বারিকেশ।

আজ, শুক্রবার দিল্লি-কলকাতা হয়ে দ্বারিকেশের দেহ ফেরার কথা তাঁর বাড়িতে। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, দ্বারিকেশের আদি বাড়ি পশ্চিম মেদিনীপুরেরই দাঁতন-২ ব্লকের তুরকা অঞ্চলের খণ্ডরুই গ্রামে। বাড়িতে স্ত্রী অন্তরা ছাড়াও রয়েছে একমাত্র মেয়ে। আপাতত তাঁরা থাকেন মেদিনীপুর শহরের শরৎপল্লি এলাকায়। সম্প্রতি জায়গা কিনে বাড়িটি তৈরি করেছিলেন দ্বারিকেশ।

নবান্ন ও দিল্লির রেসিডেন্ট কমিশনারের অফিস সূত্রে জানা গিয়েছে, দ্বারিকেশ যে সংস্থায় চাকরি করতেন, বুধবারই তার প্রতিনিধিরা তাঁর দেহ শনাক্ত করেন। অগ্নিকাণ্ডে মৃত ওই সংস্থার আরও বেশ কয়েকজন ভারতীয় কর্মীর দেহ যেমন ঝলসে গিয়েছিল, দ্বারিকেশের ক্ষেত্রে তা হয়নি। প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে, আগুনের বিষ ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। ফলে তাঁর দেহ সহজেই শনাক্ত করা গিয়েছে। ডিএনএ পরীক্ষার প্রয়োজন হয়নি।

আজ, শুক্রবার সকাল সাড়ে ছ’টা নাগাদ দিল্লির পালাম বিমানবন্দরে তাঁর দেহ পৌঁছনোর কথা। সেখান থেকে কলকাতা বিমানবন্দর হয়ে তা যাবে মেদিনীপুরে। পশ্চিম মেদিনীপুরের জেলাশাসক খুরশিদ আলি কাদেরী বলেন, ‘দাঁতন-২ ব্লকের বিডিও-র কাছ থেকে ওই খবর পেয়েছি। বিডিও পুরো ব্যবস্থাপনা তদারকি করছেন। আমরা সমস্ত বিষয়টার উপর নজর রাখছি।’

তাঁর পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, দ্বারিকেশ ঝাড়গ্রাম আইটিআই থেকে ওয়েল্ডারের ডিপ্লোমা কোর্স করে প্রথমে মুম্বইতে একটি সংস্থায় চাকরি পান। কিছুদিনের মধ্যে কুয়েতের এনবিটিসি সংস্থায় কাজের সুযোগ পান। গত ৩০ বছর ধরে তিনি কুয়েতেই ছিলেন। রোজ সকালে অফিস যাওয়ার আগে মেদিনীপুরের বাড়িতে ফোন করতেন।

বুধবার একাধিকবার ফোন করার পরেও স্বামীকে না পাওয়ায় দ্বারিকেশবাবুর সহকর্মী, কেরালার এক বাসিন্দাকে ফোন করেন অন্তরা। ওই ব্যক্তি অবশ্য সেই সময়ে কেরালায় ছিলেন। তিনি কুয়েতে ফোন করে দ্বারিকেশবাবুর স্ত্রীকে দুর্ঘটনার খবর জানান। পরে দ্বারিকেশের সংস্থার তরফ থেকে জানানো হয়, অগ্নিকাণ্ডে তাঁর মৃত্যু হয়েছে।

কুয়েতে আগুন: আগুনের লেলিহান শিখায় ছাই স্বপ্ন! ঘুমের মধ্যেই মর্মান্তিক পরিণতি, কুয়েত অগ্নিকাণ্ডে মৃতদের দেহ দেশে ফেরাতে উদ্যোগ

পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০২৩-এর মার্চে মাসে শেষ বার বাড়িতে এসেছিলেন দ্বারিকেশ। মাস খানেক ছিলেন। আগামী অক্টোবরে মেয়ের জন্মদিনে ফের বাড়ি ফেরার কথা ছিল। তাঁর মেয়ে এবার উচ্চমাধ্যমিক দেবে। সেই জন্যই আরও বেশি করে ওই সময়ে বাড়িতে ফিরবেন বলেছিলেন। কিন্তু সেই ফেরা আর হলো না।

দ্বারিকেশের শ্বশুর কমলাকান্ত পট্টনায়ক বলেন, ‘৩০ বছর কুয়েতে ছিল ও। অফিসে যাওয়ার আগে রোজ বাড়িতে ফোন করত। বুধবার আমার মেয়ে বারবার ফোন করার পরেও কেউ ফোন না ধরায় চিন্তা হচ্ছিল। কিন্তু ভাবতে পারিনি, এমন ঘটনা ঘটবে। আমার নাতনিটাকে যে কী করে বোঝাব, বুঝতে পারছি না।’





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Exit mobile version