মেয়েরা যেন তফাত যায়, দাবি মানলেন আয়োজকরাও! – controversy at institute of chartered accountants of india function in kolkata


এই সময়: আজও এ দেশেরই অনেক জায়গায় পিরিয়ডসের সময়ে মেয়েদের থাকতে হয় পরিবারের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে। দেশেরই বহু পরিবারে কন্যাসন্তানের জন্ম হলে তাড়িয়ে দেওয়া হয় মা-কে। বহু মেয়ে পাচার হয়, পরিবারের চাপে ১৮-র আগেই পড়াশোনা ছেড়েছুড়ে বিয়ে করতে বাধ্য হয়। এ দেশে আজও… এমন কত কিছুই হয়।সে তালিকাই আরও একটু লম্বা করল কলকাতার একটি ঘটনা। ঘটনাটা দিন কতক আগের। ‘দ্য ইনস্টিটিউট অফ চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অফ ইন্ডিয়া’ বা আইসিএআই-এর আয়োজিত বার্ষিক কনফারেন্সে এক স্বামীজির বক্তৃতার সময়ে তাঁর ‘আব্দার’ মেনে দর্শকাসনের প্রথম পাঁচটি রো থেকে সমস্ত মেয়েকে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। সিএ পড়ানো হয়, এমন প্রতিষ্ঠানগুলির কেন্দ্রীয় নিয়ামক সংস্থা এই ‘আইসিএআই’।

সেখানকার কনফারেন্সে ঘটে যাওয়া কাণ্ডটা মূলত সামনে এসেছে সংস্থারই প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট অমরজিৎ চোপড়ার লিঙ্কড-ইন পোস্টের সূত্রে। সেখানে তিনি দাবি করেন, গত ২২-২৩ জুন বিশ্ব বাংলা কনভেশন সেন্টারে প্রতিষ্ঠানের কনফারেন্সে ওই স্বামীজি আয়োজকদের নির্দেশ দেন, মঞ্চের সামনে প্রথম পাঁচটি রো থেকে সমস্ত মহিলাকে সরিয়ে পিছনে পাঠাতে হবে। তাঁর বক্তৃতার সময়ে কোনও মহিলা আশপাশেও থাকতে পারবেন না।

আয়োজকরা দর্শকাসনে থাকা মহিলাদের পিছনে পাঠানোর পাশাপাশি মহিলা ভলান্টিয়ার ও আয়োজকদেরও হল ছাড়তে বলেন বলে প্রাক্তন প্রেসিডেন্টের দাবি। তাঁর প্রশ্ন, ‘বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও কি এ ধরনের আধ্যাত্মিক গুরুদের কাছে স্রেফ একটা স্লোগান?’ এরপরেই সোশ্যাল মিডিয়ার নানা প্ল্যাটফর্মে ভাইরাল হয় পোস্টটি। প্রচুর মানুষ তাতে রিঅ্যাক্ট করেন। ২৮ সেকেন্ডের একটি ভিডিয়ো-ও ভাইরাল হয়েছে, যার সত্যতা যাচাই করেনি ‘এই সময়’।

সেখানে মঞ্চের উপরে এক ঘোষককে বলতে শোনা যায় – ‘সব মহিলাকে সরে যেতে অনুরোধ করা হচ্ছে।’ যেন সেই ‘ক্ষুধিত পাষাণ’-এর মেহের আলির ‘তফাত যাও’ ডাক! প্রতি বছরই দেশের চার প্রান্তে বার্ষিক কনফারেন্সের আয়োজন করে আইসিএআই। পূর্ব ভারতের কনফারেন্সটি এ বার আয়োজিত হয় কলকাতায়। দু’দিনের অনুষ্ঠানে হাজার চারেক পড়ুয়া যোগ দেন। প্রথম দিন সংস্থাই জানায়, তাদের ৪২ শতাংশ পড়ুয়াই মেয়ে। যা গত ক’বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।

কিন্তু সেই একই সংস্থা অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় দিনে ওই ধর্মগুরুর আব্দার কী ভাবে মেনে নিল, সেটা তাজ্জব করছে অনেককে। অনুষ্ঠানে হাজির এক ছাত্রীর কথায়, ‘ওই ধর্মগুরুর অনুষ্ঠান ছিল দুপুর আড়াইটে থেকে সওয়া তিনটের মধ্যে। বিষয় – কী করে সকলের চেয়ে আলাদা ভাবে ভাবা যায় … সাকসেস পাওয়া যায়। মহিলাদের অপমান করেই যদি আলাদা ভাবে বাঁচতে হয়, তা হলে তো সবার মতো গড়পরতা বাঁচাই ভালো।’

আর এক ছাত্রীর কথায়, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠানে সব সময়েই মহিলাদের এগিয়ে আসার শিক্ষা দেওয়া হয়। কিন্তু সে দিন এমন কথা কী করে আয়োজকরা মেনে নিলেন, সেটাই আমাকে অবাক করেছে।’ সূত্রের খবর, মঞ্চে ওঠার আগেই স্বামীজি নির্দেশ দেন, মহিলাদের সরাতে হবে। না হলে তিনি মঞ্চে উঠবেন না। সঙ্গে সঙ্গে আয়োজকরা রাজি হন এবং ‘অ্যাকশন’ শুরু করে দেন। এ ব্যাপারে আইসিএআই-এর কর্তারা মুখে কুলুপ এঁটেছেন।

সংস্থার পূর্ব ভারতের অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি সুস্মিতা সেনকে প্রশ্ন করা হলে তিনি প্রথমেই প্রতিবেদককে বলেন, ‘আপনাকে আমার নম্বর কে দিয়েছে? তার উত্তর না দিলে কোনও প্রশ্নের জবাব দেব না।’ এই বলে রবিবার রাতে ফোন কেটে দেন। হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ করে প্রশ্ন পাঠানো হলে সোমবার সকাল সাড়ে ১১টায় ফোন করতে বলেন।

সোমবার ফোন করা হলে সুস্মিতা বলেন, ‘এ ব্যাপারে কথা বলার আমি কেউ নই। অন্য দায়িত্বে ছিলাম। এ নিয়ে কিছু বলতে পারব না।’ আইসিএআই-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট রঞ্জিত কুমার আগরওয়ালকে কল করা হলেও তিনি ফোন তোলেননি। হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্ন পাঠানোর পরও রিপ্লাই আসেনি।

বিষয়টি নিয়ে শোরগোল পড়েছে রাজনৈতিক মহলে। সিপিএমের সম্পাদক মহম্মদ সেলিম এক্স হ্যান্ডলে বিষয়টি পোস্ট করে প্রশ্ন তোলেন – ‘রাজা রামমোহন, বিদ্যাসাগর, স্বামী বিবেকানন্দের জন্মভূমিতে এটা কী চলছে?’ তৃণমূলের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক তন্ময় ঘোষও ঘটনার নিন্দা করে এক্স-এ লেখেন – ‘অডিটররা এই মিসোজিনি আর ধর্মান্ধতার হিসেব মেলাতে পারবেন না।’

বিজেপি নেত্রী লকেট চট্টোপাধ্যায়ের বক্তব্য, ‘আমি বিষয়টা জানি না। তবে এমনটা ঘটেছে বলেই বিশ্বাস হয় না। ঘটে থাকলে একে কোনও ভাবেই আমি সমর্থন করি না।’ যে ধর্মীয় সংগঠনের স্বামীজির বিরুদ্ধে এই অভিযোগ, তাদের কলকাতাতেও একটি মন্দির আছে। সেখানে ফোন করা হলে একজন বলেন, ‘আমরা এ ব্যাপারে কিছু জানি না। গুজরাটের ভদোদরাতে ফোন করুন।’

ওয়েবসাইটে থাকা গুজরাটের ওই মন্দিরের ল্যান্ডলাইন নম্বরে ফোন করা হলেও দেখা যায়, সেটি অকেজো। নারী আন্দোলনের কর্মী শাশ্বতী ঘোষের কথায়, ‘স্বামীজিই মেয়েদের থেকে সরে গেলেন না কেন? মেয়েদের কেন সরতে হবে? আর আইসিএআই কোন আক্কেলে এ ধরনের বক্তাকে মঞ্চে বক্তৃতা দিতে দেন?’



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *