নির্বাচনের প্রাক্কালে বাংলার রাজনীতিতে দলবদল বা ‘পলিটিক্যাল মাইগ্রেশন’ কোনো নতুন ঘটনা নয়। তবে উত্তরবঙ্গের রাজনীতিতে বিজেপির শক্ত ঘাঁটিতে ফাটল ধরার জল্পনা বর্তমানে রাজ্য রাজনীতিকে উত্তপ্ত করে তুলেছে।
ভোটের মুখে পদ্মশিবিরে ভাঙন? উত্তরবঙ্গের বিজেপি বিধায়কের ঘাসফুলে যোগদানের জল্পনায় তুঙ্গে রাজনৈতিক পারদ
রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের দামামা বাজতে আর খুব বেশি দেরি নেই। ঠিক এই সন্ধিক্ষণে বঙ্গ রাজনীতিতে ফের একবার ‘দলবদল’-এর চেনা চিত্রনাট্য ফিরে আসার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের রাজনৈতিক অলিন্দে এখন একটাই প্রশ্ন— তবে কি এবার বিজেপির গড় হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চলে বড়সড় ভাঙন ধরতে চলেছে?
সূত্রের খবর, উত্তরবঙ্গের একজন প্রভাবশালী বিজেপি বিধায়ক আজই তৃণমূল কংগ্রেসে (TMC) যোগ দিতে পারেন। এই জল্পনাকে কেন্দ্র করে সরগরম হয়ে উঠেছে উত্তর থেকে দক্ষিণবঙ্গ।
উত্তরবঙ্গে পদ্মশিবিরে অস্বস্তি
বিগত লোকসভা এবং বিধানসভা নির্বাচনে উত্তরবঙ্গ দু’হাত উজাড় করে আশীর্বাদ করেছিল ভারতীয় জনতা পার্টিকে (BJP)। আলিপুরদুয়ার, কোচবিহার বা জলপাইগুড়ির মতো জেলাগুলোতে বিজেপির সাংগঠনিক শক্তি অত্যন্ত মজবুত।
কিন্তু নির্বাচনের ঠিক আগে সেই দুর্গে ফাটল ধরার সম্ভাবনা গেরুয়া শিবিরের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। শোনা যাচ্ছে, উত্তরবঙ্গের এক হেভিওয়েট বিধায়ক দীর্ঘদিনের মান-অভিমান এবং দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরে দল ছাড়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
জল্পনার কেন্দ্রে যারা
যদিও কোনও পক্ষই এখনও নাম প্রকাশ করেনি, তবে উত্তরবঙ্গের রাজনৈতিক মহলে কান পাতলে বেশ কিছু নাম উঠে আসছে। গত কয়েক মাস ধরেই উত্তরবঙ্গের বেশ কিছু বিজেপি জনপ্রতিনিধির সঙ্গে রাজ্য সরকারের মন্ত্রীদের ‘সখ্যতা’ লক্ষ্য করা গিয়েছিল।
বিশেষ করে চা-বলয় এবং তরাই-ডুয়ার্স এলাকার উন্নয়ন নিয়ে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে স্থানীয় বিধায়কদের একাংশের দূরত্ব তৈরি হয়েছিল বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা।
আজই কি তৃণমূলে যোগদান?
কলকাতার তৃণমূল ভবনে আজ দুপুরের পর এক বিশেষ সাংবাদিক বৈঠক ডাকা হয়েছে। সূত্রের খবর, সেখানেই উত্তরবঙ্গের ওই বিজেপি বিধায়ক জোড়াফুল পতাকা হাতে তুলে নিতে পারেন। যদি এই দলবদল বাস্তবে রূপ পায়, তবে তা বিজেপির জন্য বড় ধাক্কা হবে। কারণ, উত্তরবঙ্গে বিজেপির যে একচেটিয়া আধিপত্য ছিল, তাতে ফাটল ধরালে তৃণমূলের পক্ষে আসন্ন নির্বাচনে হৃত জমি উদ্ধার করা অনেক সহজ হবে।
বিজেপি ও তৃণমূলের প্রতিক্রিয়া
বিজেপির রাজ্য নেতৃত্বের দাবি, ‘ভোটের আগে ভয় দেখিয়ে বা প্রলোভন দিয়ে বিধায়ক ভাঙানোর চেষ্টা করছে শাসক দল। তবে এতে আমাদের সংগঠনের কোনো ক্ষতি হবে না।’
অন্যদিকে, তৃণমূল শিবিরের দাবি, “বিজেপির জনবিরোধী নীতি এবং উত্তরবঙ্গের মানুষের প্রতি বঞ্চনার প্রতিবাদেই অনেক বিজেপি নেতা এখন উন্নয়নের শরিক হতে চাইছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাজের প্রতি আস্থা রাখতেই এই যোগদানের ঢল।”
রাজনৈতিক প্রভাব
উত্তরবঙ্গের রাজনীতিতে এই সম্ভাব্য দলবদলের প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী।
১. সাংগঠনিক বিপর্যয়: নির্বাচনের ঠিক আগে বিধায়ক দল ছাড়লে নিচুতলার কর্মীদের মনোবল ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
২. ভাবমূর্তি সংকট: ‘দলবদল’ ইস্যুটিকে তৃণমূল বারবার বিজেপির অন্তর্কলহ হিসেবে তুলে ধরতে পারবে।
৩. ভোটের সমীকরণ: রাজবংশী বা চা-শ্রমিকদের ভোটব্যাঙ্কে এর কী প্রভাব পড়ে, এখন সেটাই দেখার।
রাজনীতি সম্ভাবনার খেলা। শেষ পর্যন্ত উত্তরবঙ্গের সেই ‘রহস্যময়’ বিধায়ক আজ ঘাসফুল শিবিরে নাম লেখান কি না, তা সময়ের অপেক্ষা। তবে এই জল্পনা যে নির্বাচনের আগে বাংলার রাজনৈতিক ময়দানকে আরও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
