জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সামাজিক কল্যাণমূলক প্রকল্পের তালিকায় অন্যতম একটি সংযোজন হলো ‘যোগ্যশ্রী’ প্রকল্প। বিশেষ করে পিছিয়ে পড়া ও তফশিলি জাতি-উপজাতিভুক্ত ছাত্রছাত্রীদের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই উদ্যোগটি এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
রাজ্যের মেধাবী অথচ অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎ গড়ে দিতে পশ্চিমবঙ্গ সরকার নিয়ে এসেছে ‘যোগ্যশ্রী’ (Yogyasree Scheme) প্রকল্প। পশ্চিমবঙ্গ অনগ্রসর শ্রেণী কল্যাণ দফতর এবং আদিবাসী উন্নয়ন দপ্তরের অধীনে পরিচালিত এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো তফশিলি জাতি (SC) এবং তফশিলি উপজাতি (ST) সম্প্রদায়ের মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের পেশাদার উচ্চশিক্ষার প্রবেশিকা পরীক্ষার জন্য তৈরি করা।
প্রকল্পের প্রেক্ষাপট ও লক্ষ্য:
ভারতের বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বাজারে জয়েন্ট এন্ট্রান্স (JEE) বা নিটের (NEET) মতো পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া অত্যন্ত ব্যয়সাপেক্ষ। অনেক দরিদ্র পরিবারের সন্তানরা মেধা থাকা সত্ত্বেও দামি কোচিং সেন্টারের খরচ বহন করতে না পেরে পিছিয়ে পড়ে। এই বৈষম্য দূর করতেই ‘যোগ্যশ্রী’ প্রকল্পের সূচনা। এই প্রকল্পের মাধ্যমে যোগ্য ছাত্রছাত্রীদের সম্পূর্ণ বিনামূল্যে কোচিং এবং মাসিক স্টাইপেন্ড প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
যোগ্যশ্রী প্রকল্পের মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ:
১. নিখরচায় কোচিং: এই প্রকল্পের অধীনে ছাত্রছাত্রীরা জয়েন্ট এন্ট্রান্স (WBJEE/JEE Main) এবং নিট (NEET) পরীক্ষার জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ পায়। অভিজ্ঞ শিক্ষকদের মাধ্যমে সারা রাজ্য জুড়ে ছড়িয়ে থাকা কেন্দ্রগুলোতে এই ক্লাস নেওয়া হয়।
২. মাসিক স্টাইপেন্ড: প্রশিক্ষণের পাশাপাশি ছাত্রছাত্রীদের যাতায়াত ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ চালানোর জন্য প্রতি মাসে নির্দিষ্ট পরিমাণ স্টাইপেন্ড (Stipend) দেওয়া হয়। এর ফলে ছাত্রছাত্রীদের পরিবারকে পড়াশোনার খরচ নিয়ে বাড়তি চিন্তায় থাকতে হয় না।
৩. সরকারি চাকরির প্রস্তুতি: বর্তমানে এই প্রকল্পের পরিধি আরও বাড়ানো হয়েছে। শুধুমাত্র ইঞ্জিনিয়ারিং বা ডাক্তারি নয়, সরকারি চাকরি যেমন— রেল, ব্যাঙ্ক, স্টাফ সিলেকশন কমিশন (SSC) এবং পুলিশের চাকরির প্রবেশিকা পরীক্ষার জন্যও বিনামূল্যে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
আবেদনের যোগ্যতা:
যোগ্যশ্রী প্রকল্পের সুবিধা পেতে হলে আবেদনকারীকে নিম্নলিখিত শর্তাবলি পূরণ করতে হবে:
আবেদনকারীকে অবশ্যই পশ্চিমবঙ্গের স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে।
ছাত্রছাত্রীকে অবশ্যই তফশিলি জাতি (SC) বা তফশিলি উপজাতি (ST) সম্প্রদায়ের হতে হবে।
আবেদনকারীকে দশম ও দ্বাদশ শ্রেণীর পরীক্ষায় সরকার নির্ধারিত ন্যূনতম নম্বর পেতে হবে।
উচ্চমাধ্যমিক স্তরের বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রছাত্রীরাই মূলত কারিগরি ও চিকিৎসা শাস্ত্রের কোচিংয়ের জন্য অগ্রাধিকার পাবেন।
প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের পরিকাঠামো:
রাজ্য সরকার এই প্রকল্পের আওতায় রাজ্যের প্রতিটি জেলায় একাধিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তুলেছে। প্রতিটি কেন্দ্রে আধুনিক লাইব্রেরি এবং নিয়মিত মক টেস্টের (Mock Test) ব্যবস্থা থাকে। এর ফলে ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের উন্নতির গ্রাফ সহজেই বুঝতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ টিউটরদের পাশাপাশি বিশেষজ্ঞ কাউন্সিলরদের মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীদের মানসিক প্রস্তুতিও নেওয়া হয়।
কী ভাবে আবেদন করবেন?
যোগ্যশ্রী প্রকল্পে আবেদনের প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সহজ। আগ্রহী ছাত্রছাত্রীরা পশ্চিমবঙ্গ অনগ্রসর শ্রেণী কল্যাণ দপ্তরের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট (www.wbbcdev.gov.in) থেকে অনলাইনে আবেদন করতে পারেন। এছাড়া নিকটস্থ ‘দুয়ারে সরকার’ ক্যাম্পে গিয়েও এই প্রকল্পের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য ও আবেদন ফর্ম সংগ্রহ করা সম্ভব। আবেদনের জন্য কাস্ট সার্টিফিকেট, আধার কার্ড, এবং শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রমাণপত্র থাকা বাধ্যতামূলক।
সাফল্যের খতিয়ান ও প্রভাব:
ইতিমধ্যেই যোগ্যশ্রী প্রকল্পের হাত ধরে রাজ্যের বহু প্রান্তিক পরিবারের সন্তান ইঞ্জিনিয়ারিং ও ডাক্তারিতে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে। গত কয়েক বছরে এই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো থেকে পাস করা বহু পড়ুয়া জাতীয় স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জায়গা করে নিয়েছে। এই সাফল্য কেবল একজন শিক্ষার্থীর নয়, বরং পুরো পরিবারের অর্থনৈতিক ভিত মজবুত করতে সাহায্য করছে।
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ‘যোগ্যশ্রী’ প্রকল্প কেবল একটি কোচিং প্রোগ্রাম নয়, এটি একটি সামাজিক বিপ্লবের নাম। পিছিয়ে পড়া শ্রেণীর মেধাবী সন্তানদের মূল স্রোতে নিয়ে আসার এই প্রয়াস আগামীর বাংলা গড়তে সাহায্য করবে। সঠিক নির্দেশিকা এবং সরকারি আর্থিক সহায়তা পেলে যে সাধারণ পরিবারের সন্তানও অসাধারণ কিছু করতে পারে, যোগ্যশ্রী তার জীবন্ত উদাহরণ।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, লাইফস্টাইল স্বাস্থ্য, প্রযুক্তির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের App, Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)
