একলব্যের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ কেন চেয়েছিলেন গুরু দ্রোনাচার্য, আজও সেই খোঁটা শুনতে হয় অর্জুনকে
Mythology
oi-Sanjay Ghoshal
কে বড়? মহাভারতে বারবার মধ্যম পাণ্ডব অর্জুনকে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। কখনও অর্জুনের সঙ্গে তুলা করা হয়েছিল একলব্যের। কখনও অর্জুনের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করে বসেন কর্ণ। কে ‘বড়’ ধনুর্ধর, তা এক বাক্যে অর্জুনের নাম করা হলেও, বারবার এই লড়াইয়ে একলব্য ও কর্ণের নাম উঠে আসে। অর্জুনকে ধনুর্বিদ্যার শিক্ষাদানের সময়ই একলব্যের পারদর্শিতা দেখে অবকা হয়ে গিয়েছিলেন গুরু দ্রোণাচার্যও।

একলব্য গুরুকুল থেকে শিক্ষা নিয়ে ফেরার পরও তাঁর ধনুর্বিদ্যা নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন না। তিনি আরও শিক্ষার প্রত্যাশী ছিলেন। তখনই তিনি মনে মনে কুরু-পাণ্ডবদের অস্ত্রশিক্ষার দায়িত্বে থাকে দ্রোণাচার্যকে নিজের গুরুর আসনে বসিয়েছিলেন। কিন্তু দ্রোণাচার্য ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় ভিন্ন কাউকে ধনুর্বিদ্যার শিক্ষা দান করেন না। তা জানা সত্ত্বেও একলব্যকে তাঁর বিশ্বাস থেকে টলানো যায়নি।
তাঁর গুরু ভক্তির প্রমাণ স্বয়ং দ্রোণাচার্যও পেয়েছিলেন। একলব্য বনে অবস্থান করে তিরন্দাজির অনুশীলন করতে শুরু করেছিলেন গুরু হিসেবে দ্রোণাচার্যের একটি মূর্তিকে সামনে রেখে। তাঁর ধ্যান করে ধনুর্বিদ্যা আয়ত্ত করেন একলব্য। একদিন দ্রোণাচার্য যখন বনে তাঁর শিষ্যদের নিয়ে অস্ত্রশিক্ষা দিচ্ছিলেন, হঠাৎই লক্ষ্য করেন একটি কুকুরকে এমনভাবেই শর নিক্ষেপ করা হয়েছে, সে বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছে। অথচ কোনও আঁচড় লাগে তাঁর শরীরে। তা দেখে রীতিমতো অবাক হয়ে যান গুরু দ্রোণাচার্য।
এমন চমৎকার ধনুর্বিদ্যা দেখে বিস্মিত হয়ে কে এই তিরন্দাজ জানতে আগ্রহী হয়ে একলব্যের আশ্রমে এসে হাজির হন দ্রোণাচার্য। সেখানে গিয়ে দেখেন একলব্য এমনই শরসন্ধান করেছেন। দ্রোণাচার্য তখন তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন, তোমার গুরু কে? একলব্য তাঁকে তখন মূর্তিটি দেখান। তাঁর গুরুভক্তি দেখে অবাক হয়ে যান কৌরব-পাণ্ডবদের অস্ত্রশিক্ষা গুরু।
কিন্তু তারপরও কেন দ্রোনাচার্য একলব্যকে গুরু দক্ষিণা হিসেবে তাঁর বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ চান? তা নিয়ে নানা মুনির নানা মত রয়েছে। একলব্য তাঁর গুরুভক্তির প্রমাণ দিয়ে বিনা দ্বিধায় গুরুকে নিজের বুড়ো আঙুল অর্পণ করেছিলেন। এরপর থেকেই অর্জুনের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। তবে কি অর্জুনকে সর্বশ্রেষ্ঠ ধনুর্ধারী বানাতেই দ্রোণাচার্য এই গুরুদক্ষিণা চেয়েছিলেন? অনেকেই মনে করেন একলব্যের মধ্যে অর্জুনের থেকেও শ্রেষ্ঠ হয়ে ওযার রসদ ছিল। কিন্তু তা করতে দেননি দ্রোণাচার্য। তিনি গুরু হিসেবে পক্ষপাত করেছেন।
আবার একাংশ মনে করেন, একলব্য তির সন্ধানে মহা পারদর্শী হলেও তাঁর মধ্যে সহনশীলতার অভাব ছিল। তাই তিনি কুকুরের ঘেউ ঘেউ শুনে বিরক্ত হয়ে অবলা জন্তুর উপর তাঁর শিক্ষার অসদ্ব্যবহার করেছিলেন। সহনশীলতার অভাবে তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর হওয়ার যোগ্যতা হারান। তিনি যদি শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর হতেন তবে জগতের অমঙ্গল হত, ক্ষতিসাধন হত। তাই তাঁর কাছে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ গুরুদক্ষিণা চেয়েছিলেন দ্রোণাচার্য।
আবার এক লেখনীতে পাওয়া যায়, একলব্য যাতে বুড়ো আঙুল ছাড়াই বিশেষভাবে দক্ষ ধনুর্ধারী হয়ে ওঠেন, বুড়ো আঙুল ছাড়াই শর সন্ধান করতে পারেন, সেই শিক্ষা দিয়েছিলেন দ্রোণাচার্য। তিনি একলব্যকে আধুনিক ধনুর্বিদ্যার জ্ঞান দিয়েছিলেন। উল্লেখ্য, আধুনিক তিরন্দাজি বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ ছাড়া তর্জনী ও মধ্যমা দিয়ে হয়। যে শিক্ষা একলব্য দ্রোণাচার্যের কাছে পেয়েছিলেন সেই মহাভারতের যুগে। আর আধুনিক তিরন্দাজরা সেই শিক্ষা আজ পাচ্ছেন।
একলব্যের ‘গুরু’ দ্রোণাচার্য তাঁর শিষ্যদের মধ্যে মধ্যম পাণ্ডব অর্জুনকেই সর্বশ্রেষ্ঠ বেছেছিলেন। এবং তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে তাঁর কাছে কোনও সংশয় ছিল না। বারবার মহাভারতের যুগে তার প্রমাণ দিয়েছেন অর্জুন। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে একলব্য ও কর্ণের মতো মহারথীদের এগিয়ে রাখা হয় পারিপার্শ্বিক অবস্থার কথা তুলে ধরে। কিন্তু যুদ্ধের শেষে অর্জুনকেই জয়ী হিসেবে দেখা যায়। অর্জুন এমন কিছু বিদ্যার্জন করেছিলেন যা জানতেন না একলব্য বা কর্ণ। কিন্তু তাঁদের মধ্যে তা অর্জন করার মতো পারদর্শিতা ছিল বলেই জানা যায়।
তাই মহাভারতের যুগে অর্জুন মহানায়ক হলেও তাঁরা নিস্ফলের দলেই রয়ে গিয়েছেন। অঙ্গরাজ কর্ম হোক বা শ্রিংভারপুরের রাজা হিরণ্যধনু ও রানি সুলেখার পুত্র যুবরাজ অভিদুম্ন ওরফে অভয় যাঁকে একলব্য নামেই বেশি চেনে তিনি অর্জুনের সমকক্ষ হিসেবেই রয়ে গিয়েছেন ভারতের অন্যতম মহাকাব্য মহাভারতের কাহিনিতে।
English summary
Why did Dronachariya want Ekalavya’s thumb as Guru Dakshina getting proof his devotion?