ভাঙনপট
রোজই ওঁদের ঘর ভাঙে গঙ্গা। মাথার উপরের ছাদ, তিল তিল করে গড়ে তোলা স্বপ্ন এক লহমায় ভেসে যায় গঙ্গার তীব্র আক্রোশে। মুর্শিদাবাদের সামশেরগঞ্জের নদী ভাঙনের দুঃসহ যন্ত্রণার সেই ছবি তুলে ধরলেন সঞ্জয় বিশ্বাস। আজ প্রথম কিস্তি
সামশেরগঞ্জ (মুর্শিদাবাদ): আজকাল ঘুমের ঘোরে বিড় বিড় করেন সামশেরগঞ্জের মহেশটোলা গ্রামের রিনা বিবি। মাঝে মধ্যেই চলে যান গঙ্গার ধারে। আগল খোলার শব্দে জেগে পিছু নেন জা এরিনা। ধরে নিয়ে আসেন গোডাউন ঘরে। গায়ে চাদর দিয়ে শুইয়ে দেন বিছানায়। দেড় মাস আগে অবশ্য রিনার অবস্থা এ রকম ছিল না। ১৫ বছর ধরে বিড়ি বেঁধে সংসার সামলেছেন। ভিনরাজ্যের নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করা স্বামী রেজাউলের টাকায় তিল তিল করে দাঁড় করিয়েছেন দোতলা বাড়ি। দু’আড়াই মাস আগেও গঙ্গা ছিল তিন কিলোমিটার দূরে, মালদার বৈষ্ণবনগরের শব্দলপুর-শোভাপুরের কাছে। ভাবতেও পারেননি, উত্তর থেকে গঙ্গা গুটি গুটি পায়ে এসে এ ভাবে তাঁর সাত কাঠা জমির উপরে দাঁড়িয়ে থাকা বাড়িটাকেই গিলে খাবে।

Mamata Banerjee : মুখ্যমন্ত্রীর ইচ্ছেয় বারাণসী ঘাটের মতো সন্ধ্যা আরতি শুরু কোন্নগরে
গত তিন বছরে পুব থেকে পশ্চিমে চারটি গ্রাম পঞ্চায়েত, ধুলিয়ান পুরসভার কিছু অংশ মিলিয়ে প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকার বাড়ি-জমি গঙ্গাগর্ভে তলিয়ে গিয়েছে। তার মধ্যে রিনার বাড়িও রয়েছে। সপ্তাহ তিনেক আগে হঠাৎই গঙ্গা চলে আসে তাঁর বাড়ির দোরগোড়ায়। স্বামী ভিনরাজ্যে থাকায় সব চাপ পড়ে একার ঘাড়ে। দুই ছেলে ও এক মেয়ে তখন কাঁচা ঘুমে। কোনও রকমে তিন সন্তানকে বুকে আগলে মাঠের মাঝখানে পালিয়ে বাঁচেন। রাত হলে আজও আস্ত বাড়িটা পড়ে যাওয়ার আওয়াজ কানে বাজে রিনার। প্রতিবেশীর এক গোডাউনে তিন ছেলে মেয়েকে নিয়ে দিন কাটছে তাঁর। বাড়ি পড়ে যাওয়ার খবর পেয়ে ফিরে এসেছিলেন স্বামী। পঞ্চায়েত চাল দিয়েছে। কিন্তু নুন-তেল-লকড়ির টাকা কে দেবে? তাই নতুন করে লড়াই শুরু করতে রেজাউল ফের চলে গিয়েছেন কেরালায়। দিনমজুরি করতে। রিনা বলেন, ‘এখনও বাড়ি তৈরির টাকা শোধ হয়নি। কিন্তু বাড়িটাই তো আর রইল না।’

West Bengal News : প্রাক্তন ফের বর্তমান? পিংলার বধূর ঘরছাড়ার নেপথ্যে পরকীয়ার চর্চা
৬০ বছর আগে একবার ভাঙন দেখেছিলেন নৌসাদ আলি। এ বার দেখলেন সেই পুরোনো ছবি। মুখে একগাল সাদা দাড়ি। সামনের পাটিতে মাত্র দু’টি দাঁত। যেন খণ্ডহর। বুকের কান্না মুখে চেপে বললেন, ‘দ্যাখেন, মানুষ এরকমটা করলে খুনোখুনি হয়ে যেত। বোমা পড়ত। থানা পুলিশ হতো। কিন্তু এটা তো প্রকৃতি করেছে। কার কাছে অভিযোগ জানাব?’ হাতে দা নিয়ে শিবপুর-ধুলিয়ান রাজ্যসড়ক দিয়ে হনহন করে হেঁটে যাচ্ছিলেন সন্তু রবিদাস। ছয় ভাই। ছ’কাঠার উপর তাঁদের বাড়ি ছিল ক’দিন আগেও। উত্তরে গঙ্গার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তিন মাস আগে ভাঙন শুরুর প্রথম দিনেই মা-গঙ্গার কোপ পড়েছিল আমাদের বাড়িটায়। সবাই মিলে গায়ে-গতরে খেটে দাঁড় করিয়েছিলাম বাড়িটা। ভাঙন হতে পারে, সেটা বুঝিনি।’ তাঁর কথায় খানিকটা কৌতুহল প্রকাশ করতেই সন্তু বলেন, ‘ক’দিন আগেও গঙ্গায় স্নান সেরে হেঁটে বাড়ি ফিরতে ফিরতে শুকিয়ে যেত পরনের কাপড়টা। এমনটা যে হতে পারে কী করে ভাবব?’ গঙ্গা পাড়ের বৃত্তান্ত তাই তাঁর কাছে এখন শুধু যন্ত্রণার এপিটাফ। হঠাৎ সম্বিত ফিরে বললেন, ‘সময় নেই। বাঁশ কাটতে যাচ্ছি। মাথার উপরে একটা আস্তানা তো করতে হবে?’

Mamata Banerjee : মমতার প্রস্তাবে কলকাতার ঘাটে গঙ্গারতির প্রস্তুতি
বাড়ি ভেঙে যাওয়ায় অন্য লোকের বারান্দায় আশ্রয় নিয়েছিলেন সারেজান বিবি। ফের ফিরে এসেছেন রাস্তার একপাশে থাকা নিজের ভাঙা বাড়িতে। ওপাশে মাত্র পাঁচ হাত দূরে গঙ্গা। ঠান্ডায় পরের দুয়ারে ছেলেপুলে নিয়ে কষ্ট হচ্ছিল। ফের ভেঙে নেওয়া জানলা-দরজা আবার ভ্যানে চাপিয়ে নিয়ে এসেছেন ছেড়ে যাওয়া বাড়িতে। ভয় করছে না? সারেজানের চোখে যেন আগুন ঠিকরে বেরোচ্ছে। বললেন, ‘মরলে মরব।’ সকলেই অবশ্য সারেজানের মতো অতটা অকুতোভয় নন। সব হারিয়ে উঠে গিয়েছেন ‘নিরাপদ’ আশ্রয়ে। (চলবে)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Exit mobile version