অন্বেষা বন্দ্যোপাধ্যায়, কুবলয় বন্দ্যোপাধ্যায়:

শুরুটা হয়েছিল এ বছর সরস্বতী পুজো দিয়ে। বিদ্যাদেবীর আরাধনায় মহিলা পুরোহিত। কলকাতায় নয়, এখান থেকে প্রায় ১২ হাজার কিলোমিটার দূরে ইউএসএ-র সিয়াটলে। তবে কলকাতা কানেকশন একটা ছিল। সেটা পুজোর পৌরোহিত্য করতে চাওয়া প্রিয়াঙ্কা বা অন্বেষার বাঙালি পরিচয়ের জন্য নয়, এই বং কানেকশনের নাম ‘শুভ মস্তু’ বা আরও স্পষ্ট ভাবে বলতে গেলে নন্দিনী ভৌমিক, যিনি ইতিমধ্যেই শহরে ও রাজ্যে পিতৃতান্ত্রিকতার বিধিনিষেধকে উড়িয়ে নিজের ছাপ রেখেছেন।

তারপর হঠাৎই একদিন সিয়াটল থেকে একটা ফোন পান নন্দিনী। মায়ের পুজো তো মেয়ে করতেই পারে — এমন যুক্তি দেখিয়ে দুর্গাপুজোর পদ্ধতি শিখিয়ে দেওয়ার আব্দার করে নন্দিনী ভৌমিককে ফোনটা করেছিলেন প্রিয়াঙ্কা। ‘এই সময়’কে প্রিয়াঙ্কা বলেন, ‘সরস্বতী পুজোর পরে মনে হলো দুর্গাপুজোই বা নয় কেন? তাই আব্দার।’ একটু ভয়ই পেয়েছিলেন নন্দিনী। তাঁর কথায়, ‘প্রথমে মনে হলো, কী ভাবে হবে? কেমন করে এত কিছু শেখাব! তারপর শুরু হলো প্রশিক্ষণ।

গত দু’মাস সপ্তাহে কয়েক দিন ভোর সাড়ে পাঁচটা থেকে অনলাইনে ক্লাস নিতাম।’ পুজো করতে আগ্রহী মহিলারা যে সংস্কৃত ভাষায় খুব সড়গড় এমনটা নয়। তবে নিয়মিত রিহার্সাল করে গিয়েছেন ওঁরা। পুজোর মুখে এসে বলছেন, ‘আমরা সংস্কৃত ও তার বাংলা তর্জমা দু’টোই বলব। উই আর ভেরি এক্সাইটেড। এই প্রথম বারোয়ারি দুর্গাপুজো করব।’

কেউ কি আপত্তি তোলেননি? ওঁরা জানাচ্ছেন, ‘প্রথা ভাঙা’ নিয়ে কেউ যে বাঁকা চোখে তাকাননি এমন নয়, তবে উৎসাহই দেখিয়েছেন অধিকাংশ। তবে মুদ্রা-মন্ত্র থেকে শুরু করে কোন ফুল কখন দিতে হবে, কোন সময়ে গঙ্গা জল দেওয়া হবে কখনই বা সন্ধিপুজোর প্রদীপ জ্বালা হবে — সবই নন্দিনী ভৌমিকের শুভ মস্তু এত ভালো ভাবে শিখিয়ে দিয়েছেন যে আত্মবিশ্বাসে ভরপুর ওঁরা।

পাঁজি মেনে পাঁচ দিন, হল্যান্ডের হইচইয়ে মেনুতে মুইঠ্যা-কালিয়া
এই একই ভাবে নন্দিনীদেবী প্রশিক্ষণ দিয়েছেন সুইডেনের গথেনবার্গের পঞ্চকন্যাকেও — ঈশানা, দীপান্বিতা, ত্রিরন্তা, অমৃতা এবং সম্পূর্ণা। সেখানকার ‘বেঙ্গলি অ্যাসোসিয়েশন’-এর তরফে ঈশানা ‘এই সময়’কে বললেন, ‘এ বার আমাদের পুজো ৫ বছরে পড়ল। থিম ‘জাগরণ’। অন্যরকম কিছু করার ইচ্ছায় আমি পুজো কমিটির তরফে সকলকে বলি আমরা পুজো করলে কেমন হয়?

৫৯টি বাঙালি পরিবারের কেউই বাধা দেননি।’ তারপর কলকাতা থেকে দেবীপুরাণ-সহ একাধিক বই আনিয়ে ও নিজেদের লেখা স্ক্রিপ্টে শুরু হয় মহড়া। তবে লিলি বিশ্বাসের কাজটা সত্যিই একটু কঠিন। এবার ওঁকে পুজোর পুরো প্রক্রিয়াটাই সারতে হবে কার্যত একা হাতে। যদিও স্থানীয় উদ্যোক্তারা তাঁকে সাধ্যমতো সাহায্য করবেন। তবু কিছুটা টেনশনে রয়েছেন তিনি। ওঁরও ভরসা নিরলস মহড়া।

কলকাতার মান-সম্মান তো রাখতে হবে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশের দুর্গাপুজোর পৌরোহিত্য করতে কলকাতা থেকে পুরোহিতরা গিয়েছেন এমন নজির বহু রয়েছে। কিন্তু প্রথম মহিলা পুরোহিত হিসেবে কলকাতা থেকে ইউরোপ পাড়ি দেওয়ার বিরল নজির গড়তে চলেছেন চলেছেন লিলি বিশ্বাস। তিনি যাচ্ছেন নেদারল্যান্ডসের রাজধানী আমস্টারডাম থেকে কিছুটা দূরের আলমের শহরে।

Durga Puja Europe: উলুবেড়িয়া থেকে ইউরোপ পাড়ি দেবী মূর্তির, অধিকারী দম্পতির সৌজন্যে লুক্সেমবার্গে দুর্গাপুজো
সেখানকার পুজোর অন্যতম উদ্যোক্তা শতরূপা বসু রায় বলছেন, ‘আমাদের পুজো দু’টো ব্রত নিয়ে শুরু হয়েছে — পরিবেশরক্ষা এবং নারী সশক্তিকরণ। প্রথম ধাপে সচেতনতা বাড়াতে পুজোর কারুকাজ তৈরি হচ্ছে নানা ধরনের বর্জ্য দিয়ে। আর দ্বিতীয় ধাপে আমরা মহিলা পুরোহিতকে দিয়ে পুজো করাতে যোগাযোগ করেছিলাম শুভ মস্তুর সঙ্গে।’

আলমের যাওয়ার আগে লিলি বিশ্বাসের কথায়, ‘শুভ মস্তুর কাছে এই পুজোর পৌরোহিত্য করার প্রস্তাব আসার পর আমাকে বেছে নেন নন্দিনীদি। এত বড় একটা দায়িত্ব পেয়ে আমি অত্যন্ত সম্মানিত।’ লিলি জানাচ্ছেন, একজনে পুরোহিতের পক্ষে দুর্গাপুজো সামাল দেওয়া কঠিন। একজন সহকারী লাগেই। কিন্তু এক্ষেত্রে কিছু করার নেই।

তাঁকে একার হাতেই শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবটা করতে হবে। এই নিয়ে অবশ্য একটু চাপে রয়েছেন নন্দিনী নিজেও। তবে বলছেন, ‘লিলি নিজের কাজে অত্যন্ত দক্ষ। ওর ওপর আমার ভরসা রয়েছে।’ এতদিন যে নারীকে শুধুই পুজোয় ‘জোগাড়’ করে সন্তুষ্ট থাকতে হতো, তাঁরাই আজ মন্ত্রোচ্চারণ, চণ্ডীপাঠ ও আরতিরও দায়িত্বে। দিগন্ত বিস্তৃত হচ্ছে। অর্ধেক আকাশ আর নয়, গোটা আকাশেই বাংলার নারীরা আজ পুরোহিত রূপেও সংস্থিতা।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Exit mobile version