জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: দুধ থেকে মাংস, ডিম থেকে মশলা— দেশজুড়ে খাদ্যশৃঙ্খল নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে বিশেষজ্ঞ মহল। ভারতের থালায় যে খাবার প্রতিদিন উঠে আসছে— তা কতটা নিরাপদ? প্রশ্নটা নতুন নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক একটি বিশদ বিশেষজ্ঞ সমীক্ষা বিষয়টিকে নতুন করে জাতীয় আলোচনায় নিয়ে এসেছে।
গ্লোবাল ওয়েলনেস (AYUSH) ও খাদ্য-নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ডা. নবল কুমার ভার্মা তাঁর গবেষণামূলক বিশ্লেষণে সতর্ক করেছেন—ভারত সহ বিশ্বের বহু দেশে খাদ্যে ভেজাল ও অতিপ্রক্রিয়াজাত খাদ্যের প্রভাব এখন আর বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়, বরং তা “নীরব মহামারি”-র রূপ নিচ্ছে।
থালায় কী ঢুকছে?
সমীক্ষায় যে খাদ্যশ্রেণিগুলিকে বিশেষ নজরে আনা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে—
দুধ, দই, পনির, ঘি
মসলা ও মশলা
সবজি ও ফল
ডিম, পোলট্রি, মাংস, মাছ
প্যাকেটজাত ও প্রক্রিয়াজাত নন-ভেজ খাবার
গবেষণায় দাবি, খাদ্যদূষণ এখন আর কয়েকটি অনিয়মের ঘটনা নয়। কৃষিজ ইনপুট, পশুখাদ্য, শিল্পোৎপাদন, কোল্ড স্টোরেজ, পরিবহণ ও খুচরো বিক্রি—পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলেই কাঠামোগত দুর্বলতা স্পষ্ট।
ডিম ও মাংসে কী পাওয়া যাচ্ছে?
ডিমে
অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ
হরমোন জাতীয় বৃদ্ধিবর্ধক
স্যালমোনেলা ও ই-কোলাই দূষণ
দূষিত পোলট্রি ফিড থেকে রাসায়নিক অবশিষ্ট
দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে বাড়ছে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR), অন্ত্রের জীবাণু ভারসাম্যহানি ও নিম্নমাত্রার দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ।
পোলট্রি ও মাংসে
প্রয়োজনের তুলনায় বহু গুণ বেশি অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার
দ্রুত ওজন বৃদ্ধির জন্য হরমোন প্রয়োগ
জবাই-পরবর্তী অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ব্যাকটেরিয়াল টক্সিন
সংরক্ষণের জন্য রাসায়নিক প্রিজারভেটিভ
ইতিবাচক আর অর্থপূর্ণ বদলের ডাক নিয়ে জি মিডিয়া তাদের ভাবনা ‘জরা সোচিয়ে’—মানে, ‘আর একবার ভাবুন’—কে সামনে রেখে এগোচ্ছে। এই উদ্যোগের লক্ষ্য একটাই: মানুষকে তাদের অধিকার আর দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করা, আর যে বিষয়গুলো আমাদের চোখ এড়িয়ে যায় অথচ গুরুত্ব পাওয়ার যোগ্য, সেগুলো সামনে আনা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ইতিমধ্যেই প্রাণিজ খাদ্যশৃঙ্খল-সংক্রান্ত অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সকে বিশ্ব জনস্বাস্থ্যের শীর্ষ দশ হুমকির একটি হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
বিভিন্ন তদন্তে উঠে এসেছে—
মাছ ও সামুদ্রিক খাদ্যে
সংরক্ষণের জন্য ফরমালিন বা অ্যামোনিয়া ব্যবহার
পারদ, ক্যাডমিয়ামের মতো ভারী ধাতু
শিল্পদূষিত জলাশয় থেকে সংগৃহীত মাছ
দীর্ঘমেয়াদে স্নায়বিক ক্ষতি, হরমোনের ভারসাম্যহানি ও ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্যাকেটজাত নন-ভেজ: সুবিধা না বিপদ?
সসেজ, নাগেটস, ফ্রোজেন মাংস, রেডি-টু-ইট কারি—এই শ্রেণির খাবারকে সমীক্ষায় “ডিজাইনগতভাবে অতিপ্রক্রিয়াজাত” বলা হয়েছে।
এগুলিতে সাধারণত
পরিশোধিত তেল
ট্রান্স ফ্যাট
অতিরিক্ত সোডিয়াম
ইমালসিফায়ার, প্রিজারভেটিভ ও ফ্লেভার এনহ্যান্সার
দীর্ঘমেয়াদি গ্রহণে মেটাবলিক সিন্ড্রোম, হৃদরোগ, কোলন ও গ্যাস্ট্রিক ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ার উল্লেখ রয়েছে আন্তর্জাতিক গবেষণায়।
‘নিয়মভঙ্গ’ নয়, ‘জৈবিক আক্রমণ’?
ডাঃ নবল কুমার ভার্মার পর্যবেক্ষণ, খাদ্যে ভেজালকে শুধু আইনি লঙ্ঘন হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি কার্যত স্বল্পমাত্রার, দীর্ঘস্থায়ী বিষক্রিয়া।
শরীরে যে প্রক্রিয়াগুলি সক্রিয় হয়—
অক্সিডেটিভ স্ট্রেস
হরমোনের ব্যাঘাত
দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ
ডিএনএ ক্ষতি
রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস
এই পথ ধরেই ক্যানসার, অটোইমিউন রোগ, বন্ধ্যাত্ব, স্নায়বিক অবক্ষয়ের মতো জটিল অসুখের সূত্রপাত হতে পারে বলে মত বিশেষজ্ঞের।
অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার: নীরব বিপর্যয়
শুধু নন-ভেজ নয়, ভেজিটেরিয়ান প্যাকেটজাত খাবারও সমানভাবে প্রশ্নের মুখে।
এই খাবারের বৈশিষ্ট্য—
উচ্চমাত্রার পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট
শিল্প-প্রক্রিয়াজাত চর্বি
কম ফাইবার ও মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টব
বহু আন্তর্জাতিক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, ক্যালোরির পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে থাকলেও অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবারের উচ্চ ব্যবহার মৃত্যুহার ও ক্যানসার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। ভারতে কম বয়সে ডায়াবেটিস, স্থূলতা, নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ও হরমোন-সংক্রান্ত ক্যানসারের উত্থান—এই খাদ্যব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত কি না, তা নিয়ে গবেষণা জোরদার হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞের মত
ডা. ভার্মার কথায়:
“আধুনিক খাদ্য পুষ্টি থেকে সরে গিয়ে জৈব-রাসায়নিক চাপের উৎস হয়ে উঠছে। নিরামিষ হোক বা আমিষ—আজকের খাদ্যতালিকায় প্রদাহ, টক্সিন ও বিপাকীয় ব্যাঘাতের ছাপ স্পষ্ট।”
তিনি জোর দিয়েছেন—
অ্যান্টিবায়োটিক-মুক্ত ও হরমোন-মুক্ত খাদ্যশৃঙ্খলে
খাদ্য-পরিমাণের আগে খাদ্যের বিশুদ্ধতায়
অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার কমানোয়
AYUSH নীতির মৌসুমি, স্থানীয় ও পাচনশক্তি-ভিত্তিক খাদ্যব্যবস্থার পুনর্মূল্যায়নে
“হাসপাতাল রোগ সারায়, খাদ্যনীতি রোগ ঠেকায়”—এই মন্তব্য তাঁর।
আমাদের করণীয়?
সমীক্ষায় প্রস্তাবিত কয়েকটি তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ—
✔ কম প্রক্রিয়াজাত, ট্রেসযোগ্য খাবার বেছে নেওয়া
✔ প্যাকেটজাত মাংস কমানো
✔ অ্যান্টিবায়োটিক-মুক্ত উৎস সমর্থন
✔ খাদ্য লেবেল পড়ার অভ্যাস
✔ স্বচ্ছতা ও কঠোর প্রয়োগের দাবি তোলা
শেষ কথা
ভেজাল নিরামিষ ও আমিষ খাদ্য, তার সঙ্গে অতি-প্রক্রিয়াজাত খাদ্যাভ্যাস—এই দ্বিমুখী সঙ্কট জনস্বাস্থ্যে গভীর প্রভাব ফেলছে বলে দাবি বিশেষজ্ঞদের।
চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়ন যেমন জরুরি, তেমনই প্রশ্ন উঠছে—
খাবার কতটা নিরাপদ?
কে দেখছে?
আর কতদিন এভাবে চলবে?
ইতিবাচক আর অর্থপূর্ণ বদলের ডাক নিয়ে জি মিডিয়া তাদের ভাবনা ‘জরা সোচিয়ে’—মানে, ‘আর একবার ভাবুন’—কে সামনে রেখে এগোচ্ছে। এই উদ্যোগের লক্ষ্য একটাই: মানুষকে তাদের অধিকার আর দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করা, আর যে বিষয়গুলো আমাদের চোখ এড়িয়ে যায় অথচ গুরুত্ব পাওয়ার যোগ্য, সেগুলো সামনে আনা।
