West Bengal
-Ritesh Ghosh
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে শুভেন্দু অধিকারী একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং আলোচিত নাম। ছাত্র রাজনীতি থেকে শুরু করে রাজ্যের মন্ত্রী, বিরোধী দলনেতা এবং অবশেষে বাংলার পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তাঁর নির্বাচিত হওয়ার এই যাত্রা রাজ্য রাজনীতির ইতিহাসে এক বর্ণময় অধ্যায়।

জন্ম ও প্রথম জীবন
শুভেন্দু অধিকারীর জন্ম ১৯৭০ সালের ১৫ ডিসেম্বর পূর্ব মেদিনীপুরের কাঁথিতে। তাঁর পিতা শিশির অধিকারী হলেন বাংলার একজন প্রবীণ ও দুঁদে রাজনীতিবিদ। একটি ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক পরিবারে বড় হয়ে ওঠার কারণে খুব অল্প বয়স থেকেই রাজনীতির প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ জন্মায়। তিনি কাঁথির পিকে কলেজ থেকে পড়াশোনা সম্পন্ন করেন এবং পরে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
ছাত্র রাজনীতি এবং কংগ্রেস পর্ব
শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক জীবনের হাতেখড়ি হয় ছাত্রাবস্থায়। তিনি কংগ্রেসের ছাত্র সংগঠন ছাত্র পরিষদের মাধ্যমে সক্রিয় রাজনীতিতে পা রাখেন। ছাত্রনেতা হিসেবে তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা এবং সাধারণ মানুষের সাথে জনসংযোগ তৈরির ক্ষমতা তাঁকে দ্রুত পরিচিতি এনে দেয়। ১৯৯৫ সালে তিনি কাঁথি পুরসভার কাউন্সিলর নির্বাচিত হন, যা ছিল তাঁর প্রথম গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী জয়।
তৃণমূল কংগ্রেস এবং নন্দীগ্রাম আন্দোলন
১৯৯৮ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করেন, তখন শুভেন্দু অধিকারী এবং তাঁর পরিবার সেই দলে যুক্ত হন।
নন্দীগ্রাম আন্দোলন (২০০৭): তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় মোড় ছিল ২০০৭ সালের নন্দীগ্রামের জমি রক্ষা আন্দোলন। এই আন্দোলনে ‘ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটি’-র অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবে তিনি সামনে আসেন এবং বামফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে এক ঐতিহাসিক প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এই আন্দোলনই তৃণমূল কংগ্রেসকে রাজ্যে ক্ষমতায় আসতে ব্যাপকভাবে সাহায্য করেছিল।
সাংসদ ও মন্ত্রী: ২০০৬ সালে তিনি কাঁথি দক্ষিণ কেন্দ্র থেকে প্রথমবার বিধায়ক নির্বাচিত হন। এরপর ২০০৯ এবং ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তিনি তমলুক কেন্দ্র থেকে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে সাংসদ হন। ২০১৬ সালে তিনি সাংসদ পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে বিধানসভা নির্বাচনে জয়ী হন এবং রাজ্য মন্ত্রিসভায় পরিবহণ, সেচ ও জলসম্পদ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তৃণমূল কংগ্রেসে তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পর অন্যতম জনপ্রিয় ও ক্ষমতাশালী নেতা হয়ে উঠেছিলেন।
বিজেপিতে যোগদান এবং বিরোধী দলনেতা
তৃণমূল কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বের সাথে মতবিরোধের জেরে ২০২০ সালের শেষের দিকে রাজ্য রাজনীতিতে এক বড় রদবদল ঘটে।
পদ্ম শিবিরে যোগদান: ২০২০ সালের ১৯ ডিসেম্বর, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের উপস্থিতিতে মেদিনীপুরের এক বিশাল জনসভায় শুভেন্দু অধিকারী আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতীয় জনতা পার্টিতে (BJP) যোগদান করেন।
২০২১-এর হাইভোল্টেজ নির্বাচন: ২০২১ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে তিনি নন্দীগ্রাম কেন্দ্র থেকে প্রার্থী হন এবং খোদ তৃণমূল নেত্রী তথা তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে এক হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে পরাজিত করে ইতিহাস সৃষ্টি করেন।
বিরোধী দলনেতা: এরপর তাঁকে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বিজেপির পরিষদীয় দলের নেতা অর্থাৎ বিরোধী দলনেতা (Leader of the Opposition) হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। বিরোধী দলনেতা হিসেবে তিনি শাসক দলের বিরুদ্ধে লাগাতার এবং জোরালো আন্দোলন চালিয়ে যান।
বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হওয়া
রাজ্যের বিরোধী দলনেতা হিসেবে রাজপথে এবং বিধানসভায় তাঁর নিরলস সংগ্রাম তাঁকে বিজেপির প্রধান মুখ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ছাত্র রাজনীতি থেকে শুরু হওয়া তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, তৃণমূল স্তরের মানুষের সাথে সংযোগ এবং সাংগঠনিক দক্ষতার ওপর ভর করে তিনি তাঁর দলকে নেতৃত্ব দেন।
অবশেষে, বাংলার সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বে বিজেপি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে এবং তাঁকে বাংলার পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছে। একজন সাধারণ ছাত্রনেতা থেকে রাজ্যের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদে তাঁর এই উত্তরণ পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব মাইলফলক।
English summary
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে শুভেন্দু অধিকারীর উত্থান এক নজিরবিহীন ঘটনা। ছাত্র রাজনীতি থেকে শুরু করে নন্দীগ্রাম আন্দোলনের পুরোধা হওয়া এবং পরবর্তীতে তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগদান—তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২১-এর নির্বাচনে মমতাকে হারানোর পর বিরোধী দলনেতা হিসেবে লড়াই চালিয়ে অবশেষে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের এক চূড়ান্ত স্বীকৃতি ও ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।